বিদেশে চিকিৎসার জন্য আদালতের অনুমতি চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টে আবেদন করেছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সেই আবেদনের দ্রুত নিষ্পত্তির আবেদন মঞ্জুর হয়নি। বুধবার কলকাতা হাই কোর্টে বিষয়টি ওঠার পর বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য স্পষ্ট করে দেন যে মামলাটি নির্ধারিত ক্রম মেনেই শুনানি হবে, আলাদা করে জরুরি ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করা হবে না।
এই সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত কিছুটা চাপে পড়েছেন অভিষেক। কারণ চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি আদালতের কাছে দ্রুত শুনানির আবেদন জানিয়েছিলেন। তাঁর আইনজীবীর পক্ষ থেকে বলা হয়, চিকিৎসার স্বার্থে মাত্র এক সপ্তাহের জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সেই কারণেই মামলাটি দ্রুত শুনানির অনুরোধ করা হয়েছিল।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চোখের সমস্যা নতুন নয়। কয়েক বছর আগে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি সেরে ফেরার সময় তিনি একটি গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। সেই ঘটনায় তাঁর মুখমণ্ডল ও চোখের নিচের অংশে গুরুতর আঘাত লাগে। এরপর থেকেই দীর্ঘদিন ধরে চোখের জটিলতায় ভুগছেন তিনি।
দুর্ঘটনার পর প্রথমে দেশের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেন অভিষেক। পরবর্তীতে বিদেশেও একাধিকবার চিকিৎসার জন্য যেতে হয়েছে তাঁকে। অতীতে তাঁর চোখে অস্ত্রোপচারও হয়েছে বলে জানা যায়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে বলেই তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি।
তবে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁর বিদেশযাত্রাকে সহজ রাখেনি। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক মামলায় নাম জড়িয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বিভিন্ন অভিযোগের তদন্তে রাজ্যের অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা (সিআইডি) সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। কয়েকটি মামলায় আদালতের নজরদারিও রয়েছে।
এর আগে একটি মামলায় হাই কোর্ট অভিষেককে আইনি সুরক্ষা বা রক্ষাকবচ দিয়েছিল। কিন্তু সেই সুরক্ষার সঙ্গে কিছু শর্তও আরোপ করা হয়। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল, আদালতের অনুমতি ছাড়া তিনি দেশের বাইরে যেতে পারবেন না। অর্থাৎ বিদেশ সফরের আগে বিচার বিভাগের অনুমোদন বাধ্যতামূলক।
এই প্রেক্ষাপটেই মঙ্গলবার হাই কোর্টে আবেদন করেন অভিষেক। সেখানে তিনি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি চান। একই সঙ্গে আবেদন করেন যাতে মামলাটি দ্রুত শোনা হয় এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু আদালত সেই অনুরোধে সাড়া দেয়নি। বিচারপতি জানান, আদালতের তালিকায় যে ক্রমে মামলাগুলি রয়েছে, সেই নিয়ম মেনেই শুনানি হবে। কোনও বিশেষ সুবিধা দিয়ে মামলাটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের এই অবস্থান বিচারব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। কোনও মামলার জরুরি শুনানি প্রয়োজন হলে তার যথেষ্ট ভিত্তি আদালতের সামনে তুলে ধরতে হয়। আদালত যদি মনে করে বিষয়টি তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ দাবি করে না, তাহলে সাধারণ নিয়মেই শুনানির নির্দেশ দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ বর্তমানে রাজ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের অন্যতম প্রধান মুখ। দলীয় টানাপোড়েন, সাংগঠনিক সংকট এবং একাধিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সময়ে তাঁর বিদেশযাত্রা নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
যদিও আদালত বিদেশ যাওয়ার আবেদন সরাসরি খারিজ করেনি, তবে দ্রুত শুনানির সুযোগ না মেলায় বিষয়টি কিছুটা সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে। ফলে চিকিৎসার জন্য তাঁর নির্ধারিত বিদেশ সফরের সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে অভিষেকের আইনজীবীরা পরবর্তী শুনানিতে চিকিৎসা সংক্রান্ত সমস্ত নথি ও প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল রিপোর্ট আদালতে জমা দিতে পারেন। সেই নথিপত্র পর্যালোচনার পর আদালত বিদেশ যাত্রার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
বর্তমানে রাজনৈতিক ও আইনি—দুই ক্ষেত্রেই চাপের মধ্যে রয়েছেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। তাই আদালতের পরবর্তী শুনানি এবং তার ফলাফলের দিকে নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহল, প্রশাসন এবং তাঁর সমর্থকদের।
সব মিলিয়ে, চিকিৎসার প্রয়োজনে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হলেও আপাতত তৎক্ষণাৎ স্বস্তি পেলেন না অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন তাঁর নজর থাকবে পরবর্তী শুনানির দিকে, যেখানে আদালত বিদেশযাত্রার আবেদন নিয়ে বিস্তারিতভাবে বিবেচনা করবে।



