বৃহস্পতিবার পশ্চিমবিধানসভার অধিবেশন কক্ষে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হল বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশনের মাধ্যমে। সাংবিধানিক রীতি মেনে অধিবেশনের শুরুতে ভাষণ দেন রাজ্যপাল আর এন রবি। আর সেই ভাষণেই উঠে আসে সরকারের আগামী দিনের অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক অবস্থান এবং বাংলাকে নিয়ে নতুন শাসকের রাজনৈতিক বার্তা।
রাজ্যপাল তাঁর বক্তৃতার শুরুতেই রাজ্যে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। তাঁর বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে অনিশ্চয়তা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, নতুন সরকার তা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থাকে সামনে রেখেই প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বক্তৃতায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে জনবিন্যাস পরিবর্তনের প্রসঙ্গ। রাজ্যপালের দাবি, দীর্ঘদিনের অনুপ্রবেশের কারণে বাংলার জনবিন্যাসে পরিবর্তন এসেছে, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ করছে বলেও তিনি জানান। সীমান্ত সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করতে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নারী ও শিশু নিরাপত্তার বিষয়েও স্পষ্ট অবস্থান নেয় সরকার। রাজ্যপাল বলেন, মহিলাদের বিরুদ্ধে অপরাধ কিংবা শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনায় প্রশাসন কোনও ধরনের আপসের পথে হাঁটবে না। এ ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। অপরাধ দমনে দ্রুত ব্যবস্থা এবং আইন প্রয়োগের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি তোলাবাজি, দুষ্কৃতীরাজ এবং মানবপাচারের মতো বিষয়ও উঠে আসে তাঁর ভাষণে। রাজ্যপালের দাবি, প্রশাসন সংগঠিত অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় যেসব বেআইনি কার্যকলাপ এবং তোলাবাজির অভিযোগ ছিল, তা বন্ধ করার জন্য বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে।
এছাড়াও রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শিল্পায়নের কথাও উঠে আসে বাজেট ভাষণে। রাজ্যপাল জানান, বছরের পর বছর ধরে দখল হয়ে থাকা বহু জমি চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই জমি উদ্ধার করে শিল্প এবং বিনিয়োগের কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। তাঁর বক্তব্য, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং শিল্প বিকাশকে নতুন সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পের প্রসঙ্গেও সরকারের প্রশংসা করেন রাজ্যপাল। বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তা এবং নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাই সরকারের লক্ষ্য। জনমুখী প্রকল্পগুলিকে আরও কার্যকরভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতও মিলেছে রাজ্যপালের বক্তব্যে। তিনি জানান, রাজ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা এবং আধুনিক পাঠক্রমকে গুরুত্ব দিয়েই এই নীতি কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উত্তরবঙ্গের চা শিল্প নিয়েও বক্তব্য রাখেন রাজ্যপাল। তিনি জানান, দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে থাকা চা বাগানগুলিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হবে। এর ফলে বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থান ফিরবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও নতুন গতি পাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বক্তৃতার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল পূর্বতন সরকারের সমালোচনা। রাজ্যপাল দাবি করেন, আগের শাসনকালে দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছিল। সাধারণ মানুষের অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি হয়নি এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প নানা কারণে আটকে ছিল।
তিনি বিশেষভাবে চিংড়িহাটা মেট্রো প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, পরিকল্পিতভাবে এই প্রকল্পের কাজ বিলম্বিত করা হয়েছিল, যার ফলে শুধু পরিকাঠামোগত উন্নয়নই বাধাগ্রস্ত হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ মানুষও। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই সমস্ত আটকে থাকা প্রকল্পের কাজ আবার শুরু হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বাজেট অধিবেশনের সূচনা ভাষণ কার্যত নতুন সরকারের নীতি ও দর্শনের একটি রূপরেখা তুলে ধরেছে। আইনশৃঙ্খলা, সীমান্ত সুরক্ষা, নারী নিরাপত্তা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান এবং উন্নয়নমূলক কর্মসূচিকে সামনে রেখে ‘ভয়মুক্ত ও ভরসার বাংলা’ গড়ার বার্তাই দিতে চেয়েছে সরকার।
এখন নজর ২২ জুনের দিকে, যেদিন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বিধানসভায় পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করবেন। সেখানে সরকারের প্রতিশ্রুতিগুলি বাস্তবায়নের জন্য কী ধরনের আর্থিক রূপরেখা এবং প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়, সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল এবং রাজ্যের মানুষ।



