শনিবার ভোররাতে কলকাতার কালীঘাটে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে পুলিশের তল্লাশি অভিযান ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে। অভিযোগ, গভীর রাতে শালবনি থানার একটি দল তাঁর পটুয়াপাড়ার বাসভবনে পৌঁছে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর তালা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করে তল্লাশি চালায়।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ সহকারী হিসেবে পরিচিত সুমিত রায়ের সন্ধান করা। তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে নেমেই শালবনি থানার পুলিশ কলকাতায় আসে।
তদন্তকারী সূত্রের দাবি, পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনির এক তৃণমূল নেতা অভিযোগ করেছেন যে, টিকিট পাইয়ে দেওয়ার নাম করে সুমিত রায় তাঁর কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই মামলা দায়ের হয় এবং তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্ত চলাকালীন মোবাইল টাওয়ারের তথ্য বিশ্লেষণ করে সুমিতের সম্ভাব্য অবস্থান সম্পর্কে কিছু সূত্র পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়েছে। সেই সূত্র ধরেই পুলিশ কালীঘাটের ওই ঠিকানায় পৌঁছয়।
জানা গিয়েছে, শনিবার রাত প্রায় আড়াইটে নাগাদ শালবনি থানার একটি বড় দল ডিএসপির নেতৃত্বে কলকাতায় আসে। প্রথমে কালীঘাট থানায় গিয়ে প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এরপর ভোররাত তিনটে নাগাদ পুলিশবাহিনী অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ির সামনে পৌঁছয়। অভিযানে মহিলা পুলিশকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।
সূত্রের খবর, বাড়ির বাইরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয় এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যদেরও সেখানে দেখা যায়। পুলিশকর্মীরা দীর্ঘ সময় ধরে বাড়ির সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু কোনও সাড়া না মেলায় শেষ পর্যন্ত তালা ভেঙে ভিতরে ঢোকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তদন্তকারীরা কয়েক ঘণ্টা ধরে বাড়ির বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালান। সকাল সাতটার কিছু পরে তাঁরা সেখান থেকে বেরিয়ে যান। তবে পুলিশ সূত্রের দাবি, অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট ব্যক্তির খোঁজ করা এবং তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা।
ঘটনার পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই অভিযোগ করেন যে, তালা ভেঙে তাঁর বাড়িতে ঢুকে গোটা বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, ঘটনার সমস্ত তথ্য ও রেকর্ড সংরক্ষিত রয়েছে। একইসঙ্গে তিনি জানান, তদন্তকারী সংস্থার সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, এই অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে দ্রুত কালীঘাটের উদ্দেশে রওনা দেন তৃণমূল নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সরাসরি অভিষেকের বাড়িতে প্রবেশ করেন এবং কিছু সময় সেখানে অবস্থান করেন বলে জানা গিয়েছে।
দলীয় সূত্রের খবর, অভিষেকের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। যদিও বাড়ি থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনও উত্তর দেননি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলে ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক জল্পনা আরও বেড়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এমন একটি সময় এই তল্লাশি অভিযান হয়েছে যখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক মামলার তদন্তের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক সময়ে বিধানসভার স্বাক্ষর জালিয়াতি এবং বিতর্কিত মন্তব্য সংক্রান্ত দুটি পৃথক মামলায় তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছে।
স্বাক্ষর জালিয়াতি সংক্রান্ত মামলায় সম্প্রতি তাঁকে ভবানীভবনে হাজিরা দিতে হয়েছে। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা ধরে তাঁকে জেরা করা হয় বলে সূত্রের দাবি। ওই মামলায় তাঁকে আবারও হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, আরেকটি মামলায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে সমনও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। সেই মামলার তদন্তে তাঁকে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হাজিরা দিতে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি একটি পৃথক তদন্তে তাঁকে ইডি দপ্তরেও উপস্থিত থাকতে হবে বলে জানা গিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকারীর বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের তদন্তে বাড়িতে পুলিশি তল্লাশি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিরোধীরা ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে তুলে ধরতে শুরু করেছে। আবার শাসকদলের একাংশের দাবি, আইন অনুযায়ী তদন্ত চলছে এবং সত্য সামনে আসা উচিত।
তবে এখনও পর্যন্ত সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হয়নি। একইভাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এই মামলায় কোনও প্রত্যক্ষ অভিযোগও সামনে আসেনি। ফলে তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে কী তথ্য সামনে আসে, সেটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
শনিবারের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক আবহ আরও উত্তপ্ত হয়েছে। গভীর রাতে তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ, কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্রুত সেখানে পৌঁছে যাওয়া—সব মিলিয়ে ঘটনাটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন নজর তদন্তের অগ্রগতির দিকে এবং পুলিশ পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই।



