কলকাতার রাজনৈতিক অঙ্গনে মঙ্গলবার দুপুরে নতুন করে চর্চার কেন্দ্রে উঠে এলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কারণ, তিনি যখন নির্বাচনী প্রচারে করা ‘ডিজে’ মন্তব্য সংক্রান্ত মামলায় সিআইডির ডাকে ভবানীভবনে হাজির হয়েছেন, ঠিক সেই সময়েই তাঁর কালীঘাটের বাসভবনে পৌঁছে যায় কলকাতা পুরসভার একদল আধিকারিক।
সূত্রের খবর, ১২১ নম্বর কালীঘাট রোডের পটুয়াপাড়ার ওই বাড়িতে কয়েকজন পুর ইঞ্জিনিয়ার এবং আধিকারিক আধুনিক পরিমাপক যন্ত্র নিয়ে পৌঁছন। বাড়ির চারপাশ, বিভিন্ন নির্মাণাংশ এবং সংলগ্ন এলাকা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হয়। শুধু মাপজোকই নয়, পর্যবেক্ষণের তথ্য লিখিতভাবে নথিবদ্ধও করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি বাড়ির কোনও অংশে বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে? কিংবা নির্ধারিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত নির্মাণ বা জমি দখল করে কোনও অংশ তৈরি করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতেই কি এই অভিযান? যদিও এ বিষয়ে সাংবাদিকদের কোনও প্রশ্নের উত্তর দিতে চাননি পুরসভার কর্তারা।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, পুর আধিকারিকদের এই পরিদর্শনের সময় বাড়িতে উপস্থিত ছিলেন না অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তখন সিআইডির জেরার মুখোমুখি হতে ভবানীভবনে ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতেই পুরকর্তাদের এই পরিদর্শন ঘিরে স্থানীয় তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, বাড়ির মালিক অনুপস্থিত থাকাকালীন এভাবে পরিদর্শন এবং মাপজোক কতটা স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে?
তবে পুর প্রশাসনের একটি অংশের বক্তব্য, কোনও নির্মাণ সংক্রান্ত অভিযোগ বা নথিগত অসঙ্গতি নিয়ে সংশয় তৈরি হলে নিয়ম মেনেই পরিদর্শন করা হয়। সেই ক্ষেত্রে সম্পত্তির মালিকের উপস্থিতি সবসময় বাধ্যতামূলক নয়। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছ থেকে নথি বা ব্যাখ্যা চাওয়া হতে পারে।
উল্লেখ্য, এর আগেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যুক্ত একটি আবাসনকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। হরিশ মুখার্জি স্ট্রিটের ‘শান্তিনিকেতন’ নামে পরিচিত বাসভবনের কিছু অংশে অনুমোদনবিহীন নির্মাণের অভিযোগ ওঠার পর কলকাতা পুরসভা নোটিস পাঠিয়েছিল। সেই সময় সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির বিস্তারিত নকশা এবং নির্মাণ সংক্রান্ত নথি জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। জানা যায়, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে কিছুটা অতিরিক্ত সময়ও চেয়েছিলেন অভিষেক।
সেই ঘটনার পর এবার কালীঘাটের বর্তমান বাসভবন নিয়ে পুরসভার এই পদক্ষেপ নতুন করে কৌতূহল তৈরি করেছে। প্রশাসনিক মহলের একাংশের মতে, আগের ঘটনার পর থেকেই একাধিক সম্পত্তির নথি ও নির্মাণ সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তারই অংশ হিসেবে মঙ্গলবারের এই মাপজোক হতে পারে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, গত কয়েক দিন ধরে একের পর এক তদন্তকারী সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদ, বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপকে ঘিরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনীতি যথেষ্ট উত্তপ্ত। সেই আবহে পুরসভার এই অভিযানকে ঘিরে রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও সামনে আসছে।
যদিও কলকাতা পুরসভার পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে বাড়ির কোনও অংশে অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে কি না, কিংবা ভবিষ্যতে কোনও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে কি না, তা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা বজায় রয়েছে।
তবে মঙ্গলবারের ঘটনাপ্রবাহে এক বিষয় স্পষ্ট, কালীঘাটের এই বাড়িকে ঘিরে নজরদারি এবং প্রশাসনিক তৎপরতা নতুন করে জল্পনা উসকে দিয়েছে। এখন পুরসভার পর্যবেক্ষণ রিপোর্টে কী উঠে আসে এবং তার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের।



