Home/International/বদলে যাচ্ছে বিশ্ব মানচিত্রের চেনা ছবি! আফ্রিকা বড়, ইউরোপ-আমেরিকা ছোট—রাষ্ট্রসংঘে প্রস্তাব পাশ
Advertisement
#16
Advertisement
#17
Advertisement
#18
Advertisement
#19
Advertisement
#20

বদলে যাচ্ছে বিশ্ব মানচিত্রের চেনা ছবি! আফ্রিকা বড়, ইউরোপ-আমেরিকা ছোট—রাষ্ট্রসংঘে প্রস্তাব পাশ

প্রায় পাঁচশো বছর ধরে প্রচলিত বিশ্ব মানচিত্রের চেহারা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠল রাষ্ট্রসংঘে। সাধারণ পরিষদে ‘ইকুয়াল আর্থ’ নামে একটি নতুন মানচিত্র ব্যবহারের প্রস্তাব বিপুল ভোটে অনুমোদিত হয়েছে। নতুন এই মানচিত্রে মহাদেশগুলির প্রকৃত আয়তনের তুলনামূলক চিত্র আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে প্রচলিত মানচিত্রের তুলনায় আফ্রিকাকে বড় এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাকে তুলনামূলক ছোট দেখানো হবে। ভোটাভুটিতে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে থাকলেও একমাত্র আমেরিকা বিরোধিতা করেছে। ছ’টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।

Joyjit Sengupta

Joyjit Sengupta

Author from Orange Prime News

Sep 5, 2026
•5 min read•
25
Share:
বদলে যাচ্ছে বিশ্ব মানচিত্রের চেনা ছবি! আফ্রিকা বড়, ইউরোপ-আমেরিকা ছোট—রাষ্ট্রসংঘে প্রস্তাব পাশ

রাষ্ট্রসংঘে ১৬৪-১ ভোটে পাশ নতুন মানচিত্রের প্রস্তাব

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে এতদিন যে মানচিত্র পরিচিত, তার বিকল্প হিসেবে নতুন একটি মানচিত্র ব্যবহারের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ। ‘ইকুয়াল আর্থ’ নামে প্রস্তাবিত মানচিত্রের মূল উদ্দেশ্য পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশের প্রকৃত আয়তনের পার্থক্যকে তুলনামূলকভাবে সঠিকভাবে তুলে ধরা।

শনিবারের ভোটাভুটিতে মোট ১৬৫টি দেশ অংশ নেয়। তার মধ্যে ১৬৪টি দেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়। বিপক্ষে ভোট পড়ে মাত্র একটি—আমেরিকার। আরও ছ’টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল বলে জানা গিয়েছে।

এত বড় ব্যবধানে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হওয়ায় বিশ্ব মানচিত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে প্রস্তাব পাশ হলেও সব দেশকে অবিলম্বে ‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্র ব্যবহার করতেই হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়নি।

কেন বদলানোর প্রয়োজন পড়ল প্রচলিত মানচিত্র?

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত মানচিত্রগুলির মধ্যে অন্যতম হল ‘মার্কেটর প্রজেকশন’। ষোড়শ শতকে ইউরোপীয় মানচিত্রবিদ জেরার্ডাস মার্কেটর এই পদ্ধতি তৈরি করেছিলেন। ১৫৬৯ সালে প্রকাশিত সেই মানচিত্রের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সমুদ্রপথে নাবিকদের যাতায়াত সহজ করা।

সমুদ্রযাত্রার ক্ষেত্রে দিক নির্ধারণে এই মানচিত্র অত্যন্ত কার্যকর ছিল। কিন্তু পৃথিবী গোলাকার, আর মানচিত্র সাধারণত সমতল—এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করতে গিয়ে মহাদেশগুলির আয়তন বিকৃত হয়ে যায়।

ফলে মানচিত্রে কোনও কোনও অঞ্চল বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় দেখায়, আবার কিছু অঞ্চল তুলনামূলক ছোট হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে এই বিকৃত চিত্রই স্কুল, বই এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কাজে বিশ্বকে দেখার অন্যতম প্রচলিত মাধ্যম হয়ে রয়েছে।

আফ্রিকার আয়তন নিয়ে সবচেয়ে বড় পার্থক্য

মার্কেটর মানচিত্র নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনার একটি কারণ আফ্রিকা ও গ্রিনল্যান্ডের তুলনামূলক আকার। প্রচলিত মানচিত্রে দুই অঞ্চলকে অনেক সময় কাছাকাছি আয়তনের বলে মনে হতে পারে।

বাস্তবে কিন্তু চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। আফ্রিকার আয়তন গ্রিনল্যান্ডের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বেশি। গোলাকার পৃথিবীকে সমতলে তুলে ধরার সময় মানচিত্রের প্রজেকশন পদ্ধতির কারণে এই বিশাল পার্থক্য চোখে পড়ে না।

‘ইকুয়াল আর্থ’ ধরনের মানচিত্রে এই সমস্যাটিই কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অর্থাৎ কোন মহাদেশ বাস্তবে কতটা বড় বা ছোট, তার তুলনামূলক ধারণা যাতে মানচিত্র দেখেই পাওয়া যায়, সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকাও তুলনায় ছোট দেখাবে

নতুন মানচিত্রে শুধু আফ্রিকাই বড় হয়ে উঠবে না। প্রচলিত মার্কেটর প্রজেকশনের তুলনায় উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপকেও তুলনামূলক ছোট আকারে দেখা যাবে।

এর কারণ এই নয় যে মহাদেশগুলির প্রকৃত আয়তন বদলে যাচ্ছে। পরিবর্তন হচ্ছে শুধুমাত্র পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতল মানচিত্রে উপস্থাপনের পদ্ধতিতে।

বিশেষ করে মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি থাকা ভূখণ্ডগুলিকে প্রচলিত মার্কেটর মানচিত্রে বাস্তবের তুলনায় বড় দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। নতুন প্রজেকশনে সেই বিকৃতিকে কমিয়ে মহাদেশগুলির প্রকৃত আয়তনের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

এশিয়াই সবচেয়ে বড় মহাদেশ

নতুন মানচিত্রের প্রসঙ্গ উঠলেও মহাদেশগুলির প্রকৃত ক্রম বদলাচ্ছে না। আয়তনের বিচারে এশিয়াই এখনও বিশ্বের বৃহত্তম মহাদেশ।

তারপর আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অ্যান্টার্কটিকা এবং ইউরোপের অবস্থান। সবচেয়ে ছোট মহাদেশ হিসেবে ধরা হয় ওশিয়ানিয়াকে।

অর্থাৎ নতুন মানচিত্র কোনও মহাদেশের ভৌগোলিক আয়তন পরিবর্তন করছে না। বরং এতদিন মানচিত্রে যে তুলনামূলক বিকৃতি দেখা যেত, তা কমিয়ে বাস্তব আয়তনের কাছাকাছি একটি ছবি তুলে ধরার লক্ষ্যই এর পিছনে রয়েছে।

টোগোর উদ্যোগে প্রস্তাব রাষ্ট্রসংঘে

‘ইকুয়াল আর্থ’ মানচিত্র ব্যবহারের প্রস্তাবটি রাষ্ট্রসংঘে পেশ করেছে আফ্রিকার দেশ টোগো। দেশটির বিদেশমন্ত্রী রবার্ট ডুসির বক্তব্য, মানচিত্র শুধুমাত্র ভৌগোলিক তথ্য দেখায় না, মানুষের চিন্তাভাবনা এবং পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গির উপরও প্রভাব ফেলে।

তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত মানচিত্র পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আকার সম্পর্কে এমন একটি ধারণা তৈরি করে যা বাস্তবের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। সেই কারণে মানচিত্রের উপস্থাপন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে।

আফ্রিকার পক্ষ থেকে এই উদ্যোগ নেওয়ার পিছনে মহাদেশটির ভৌগোলিক অবস্থান ও আয়তনকে আরও বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

কেন বিরোধিতা করল আমেরিকা?

প্রস্তাবটির বিরোধিতা করা একমাত্র দেশ ছিল আমেরিকা। ওয়াশিংটনের বক্তব্য, ষোড়শ শতকে তৈরি একটি মানচিত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে বিতর্ক তৈরি করার চেয়ে বর্তমান বিশ্বের আরও জরুরি সমস্যাগুলির দিকে রাষ্ট্রসংঘের নজর দেওয়া উচিত।

মার্কিন প্রতিনিধি ইয়ারিনা ফেরেনসেভিচের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রসংঘের এমন কোনও ‘আদর্শগত এজেন্ডা’ গ্রহণ করা উচিত নয়, যা সংগঠনের মূল কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

অর্থাৎ আমেরিকার আপত্তি মূলত মানচিত্রের ভৌগোলিক বিষয়টির চেয়ে রাষ্ট্রসংঘের অগ্রাধিকার এবং এই ধরনের উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে।

তবে আমেরিকার বিরোধিতা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়েছে।

প্রস্তাব পাশ হলেও বাধ্যতামূলক নয়

রাষ্ট্রসংঘে প্রস্তাবটি পাশ হওয়াকে অনেকেই বিশ্ব মানচিত্রের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে আগামী দিন থেকেই বিশ্বের সব স্কুল, সরকারি প্রতিষ্ঠান বা আন্তর্জাতিক সংস্থায় নতুন মানচিত্র ব্যবহার বাধ্যতামূলক হয়ে গেল।

জানা যাচ্ছে, ‘ইকুয়াল আর্থ’ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনও বাধ্যতামূলক নির্দেশ দেওয়া হয়নি। ফলে কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠান কোন ধরনের মানচিত্র ব্যবহার করবে, সেই সিদ্ধান্ত অনেকটাই তাদের নিজস্ব ব্যবস্থার উপর নির্ভর করবে।

তবে রাষ্ট্রসংঘের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রস্তাবটি বিপুল সমর্থন পাওয়ায় শিক্ষা, ভূগোল এবং মানচিত্র তৈরির ক্ষেত্রে এর প্রভাব নিয়ে ভবিষ্যতে আলোচনা বাড়তে পারে।

মানচিত্র শুধু ছবি নয়, দৃষ্টিভঙ্গিও

বিশ্ব মানচিত্র সাধারণ মানুষের কাছে পৃথিবীকে বোঝার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। স্কুলের পাঠ্যবই থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদ—সর্বত্র মানচিত্রের ব্যবহার রয়েছে। ফলে মানচিত্রে একটি অঞ্চল বড় বা ছোট দেখানোর বিষয়টি মানুষের ভৌগোলিক ধারণাকেও প্রভাবিত করতে পারে।

‘ইকুয়াল আর্থ’ নিয়ে বিতর্কের মূল জায়গাটিও সেখানেই। পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠকে সমতলে দেখানোর ক্ষেত্রে কোনও মানচিত্রই সব দিক থেকে নিখুঁত নয়। কোথাও আয়তন, কোথাও দূরত্ব, আবার কোথাও দিকের ক্ষেত্রে কিছুটা বিকৃতি থাকতেই পারে।

তাই নতুন মানচিত্রের লক্ষ্যকে একটি নির্দিষ্ট সুবিধার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হিসেবে দেখা যেতে পারে—এই ক্ষেত্রে মহাদেশগুলির আয়তনের তুলনাকে।

পাঁচশো বছরের পুরনো অভ্যাসে বদলের ইঙ্গিত

১৫৬৯ সালে মার্কেটর প্রজেকশন তৈরি হওয়ার পর কয়েক শতক ধরে সেটি বিশ্বকে মানচিত্রে দেখানোর অন্যতম পরিচিত পদ্ধতি হয়ে উঠেছে। নৌপরিবহণের ক্ষেত্রে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও যথেষ্ট।

কিন্তু আধুনিক ভূগোল ও প্রযুক্তির যুগে পৃথিবীকে উপস্থাপনের আরও নানা পদ্ধতি তৈরি হয়েছে। ফলে কোন মানচিত্র কোথায় এবং কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

রাষ্ট্রসংঘের সাম্প্রতিক প্রস্তাব সেই দীর্ঘদিনের অভ্যাসের উপরই প্রশ্ন তুলল। তবে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করবে বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতার উপর।

সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদে ‘ইকুয়াল আর্থ’ নিয়ে প্রস্তাব পাশ হওয়া মানচিত্রের জগতে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। আফ্রিকার প্রকৃত আয়তনকে তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট করে দেখানো থেকে শুরু করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার আকারের বিকৃতি কমানোর চেষ্টা—নতুন মানচিত্রের মূল লক্ষ্য সেখানেই। তবে আপাতত এটি বাধ্যতামূলক নয়। ফলে চেনা বিশ্ব মানচিত্র রাতারাতি বদলে যাচ্ছে না, কিন্তু পৃথিবীকে কীভাবে মানচিত্রে দেখানো হবে, সেই বিতর্ক যে আরও জোরালো হল, তাতে সন্দেহ নেই।

Advertisement
#6
Advertisement
#7
Advertisement
#8
Advertisement
#9
Advertisement
#10