বারুইপুরের বহুল আলোচিত নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের মামলায় তদন্ত চলাকালীন পুলিশের অভিযানে মৃত্যু হল প্রধান অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের। মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘটনাস্থলে পুনর্নির্মাণের সময় এই ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করার পাশাপাশি এক পুলিশকর্মীর অস্ত্র ছিনিয়ে গুলি চালানোর চেষ্টা করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হন পুলিশ সদস্যরা।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে প্রভাস মণ্ডলকে বারুইপুরের সূর্যপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে অপরাধ সংঘটনের ধারাবাহিকতা পুনর্গঠন এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলছিল। সেই সময়ই অভিযুক্ত আচমকা পালানোর চেষ্টা করে বলে অভিযোগ। পুলিশের দাবি, সে এক আধিকারিকের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করে এবং পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এরপর আত্মরক্ষার স্বার্থে গুলি চালানো হয়।
গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রভাসকে দ্রুত বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর গোটা বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, নিয়ম মেনেই সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে।
এই মামলার তদন্তে প্রভাস মণ্ডলকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের হাতে আসা একটি সিসিটিভি ফুটেজে নাবালিকার সঙ্গে তাকে শেষবার হাঁটতে দেখা যায় বলে দাবি পুলিশের। সেই সূত্র ধরেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জেরার ভিত্তিতে তদন্তকারীরা নাবালিকার বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন বলেও দাবি করা হয়েছে।
পুলিশের বক্তব্য, প্রভাসকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় বেশ কয়েকবার বয়ান পরিবর্তন করতে দেখা যায়। তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে সে পরস্পরবিরোধী তথ্য দিচ্ছিল বলেও অভিযোগ। তবু তার কাছ থেকে পাওয়া একাধিক তথ্যের ভিত্তিতেই মামলার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
এদিকে, একই মামলায় আরও এক অভিযুক্ত কবীর মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার গ্রেপ্তারের পর এই মামলায় মোট ধৃতের সংখ্যা বেড়ে চার হয়েছে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে অপরাধ সংঘটনের পরিকল্পনা, ভূমিকা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও তথ্য মিলতে পারে।
বারুইপুরের এই ঘটনা সামনে আসার পর গোটা এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। নাবালিকার দেহ উদ্ধারের পর ক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসন একাধিক পদক্ষেপও গ্রহণ করে।
ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুলিশকে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি প্রকাশ্যে জানান, অপরাধীদের কোনওভাবেই রেয়াত করা হবে না এবং তদন্তে গাফিলতির প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে বারুইপুর সফরে গিয়ে তিনি রাজ্য পুলিশের মহাপরিচালককে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির নির্দেশ দেন।
এই মামলার পাশাপাশি বিক্ষোভ চলাকালীন পুলিশের উপর হামলা, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর এবং আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনাতেও পৃথক তদন্ত চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, সেই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত অন্তত ২০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ভিডিও এবং অন্যান্য প্রমাণ সংগ্রহ করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হচ্ছে।
তদন্তকারীদের দাবি, নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের মূল মামলার পাশাপাশি সহিংসতার ঘটনাগুলিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। আইন ভঙ্গের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই প্রযোজ্য ধারায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তবে প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরেও পৃথক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। পুলিশের গুলিতে অভিযুক্তের মৃত্যুর ক্ষেত্রে যে নিয়ম অনুযায়ী তদন্ত ও বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, সেই প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।
বারুইপুরের এই নৃশংস ঘটনায় তদন্ত এখন এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একদিকে মূল অপরাধের তদন্ত এগোচ্ছে, অন্যদিকে পুলিশের অভিযানে অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনাও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই মামলায় আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।



