বারুইপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে অশান্তি তৈরি হয়েছিল, তার জেরে প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে। ঘটনার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এলাকায় অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। বুধবার গভীর রাত পর্যন্ত চলা অভিযানে আরও ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে একই অভিযোগে ১৮ জনকে আটক করা হয়েছিল। ফলে এই মামলায় হিংসা ও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মোট গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৪০।
পুলিশ সূত্রের দাবি, নতুন করে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারি সম্পত্তি নষ্ট, অগ্নিসংযোগ, পুলিশের উপর হামলা এবং গণপিটুনিতে এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে আরও কয়েকজনের নাম উঠে আসায় তাঁদের খোঁজেও তল্লাশি চলছে। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।
গত রবিবার সকালে একটি পুকুর থেকে নাবালিকার দেহ উদ্ধারের পর থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বারুইপুরের সূর্যপুর এলাকা। স্থানীয় বাসিন্দারা দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং কঠোর শাস্তির দাবিতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বিভিন্ন জায়গায় রাস্তা অবরোধ, যানবাহনে ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পুলিশ বিক্ষোভ সরাতে গেলে সংঘর্ষ বাধে বলেও অভিযোগ। সেই উত্তেজনার মধ্যেই এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গণপিটুনি দেওয়া হয়, পরে হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
এই পরিস্থিতির পর প্রশাসন এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে এবং টহল বাড়ানো হয়। তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান সংগ্রহ করা হচ্ছে। গোটা ঘটনার তদন্তে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) কাজ করছে।
মঙ্গলবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট ভাষায় জানান, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। তিনি দাবি করেন, পরিকল্পিতভাবে কিছু উস্কানিদাতা পরিস্থিতিকে অশান্ত করার চেষ্টা করেছে। প্রশাসনের হাতে এমন প্রায় ২০০ জনের পরিচয় রয়েছে, যাঁদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ মিললে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর থেকেই অভিযানের গতি আরও বৃদ্ধি পায়। পুলিশ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক দলে ভাগ হয়ে তল্লাশি চালায়। তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের শনাক্ত করতে প্রযুক্তির পাশাপাশি স্থানীয় সূত্র থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এদিকে, এই মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে পুনর্নির্মাণের সময় অভিযুক্ত পালানোর চেষ্টা করলে গুলি চালাতে বাধ্য হন কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা। সেই গুলিতেই তাঁর মৃত্যু হয়। তবে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যদপ্তর জানিয়েছে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নির্দেশিকা মেনে প্রভাস মণ্ডলের ময়নাতদন্তের জন্য তিন সদস্যের বিশেষ মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এই বোর্ডে রাজ্যের তিনটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাঁদের উপস্থিতিতেই সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
ময়নাতদন্তের আগে মৃতদেহের ডিজিটাল এক্স-রে করা হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, গুলির সঠিক প্রবেশপথ, অবস্থান এবং আঘাতের প্রকৃতি নির্ধারণে এই পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রথমে মৃতদেহ কাঁটাপুকুর মর্গে পাঠানো হলেও পরে তা কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে স্থানান্তরিত করা হয়, যাতে বিশেষজ্ঞ বোর্ডের তত্ত্বাবধানে পরীক্ষা সম্পন্ন করা যায়।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পুলিশের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রয়োজনে ফরেন্সিক ও ব্যালিস্টিক পরীক্ষার রিপোর্টও যুক্ত করা হবে।
অন্যদিকে, মূল নাবালিকা ধর্ষণ ও হত্যার মামলার তদন্তও সমান গুরুত্ব দিয়ে এগোচ্ছে। ইতিমধ্যে একাধিক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্তকারী সংস্থা ঘটনার সময়রেখা পুনর্গঠন, ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য মিলিয়ে ঘটনার পূর্ণ চিত্র সামনে আনার চেষ্টা করছে।
প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। কোনও ধরনের গুজব বা উস্কানিমূলক প্রচার রুখতে সামাজিক মাধ্যমের উপরও নজর রাখা হচ্ছে। পুলিশ সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার এবং গুজবে কান না দেওয়ার আবেদন জানিয়েছে।
এদিকে, মানবাধিকার কমিশনের নির্দেশিকা অনুসারে এনকাউন্টার সংক্রান্ত সমস্ত নথি সংরক্ষণ, ভিডিওগ্রাফি এবং প্রমাণ সংগ্রহের কাজও করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে স্বাধীন তদন্ত সংস্থার কাছেও তথ্য তুলে দেওয়া হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত মিলেছে।
বারুইপুরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে প্রশাসনের দাবি, অপরাধমূলক ঘটনা এবং পরবর্তী হিংসার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে নারাজ পুলিশ।
বর্তমানে পুলিশের প্রধান লক্ষ্য একদিকে নাবালিকা হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ সত্য উদঘাটন, অন্যদিকে হিংসা ও ভাঙচুরে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা। তদন্ত যত এগোবে, ততই নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।



