বারুইপুর ধর্ষণ-খুন মামলায় তদন্তে নতুন দায়িত্ব, কেন বদল হল অফিসার?
রাজ্যজুড়ে আলোড়ন ফেলা বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তদন্তের গতি আরও বাড়াতে নতুন পদক্ষেপ নিল পুলিশ। মামলার তদন্তভার এবার ডিএসপি পদমর্যাদার আধিকারিক শান্তনু মুখোপাধ্যায়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর থেকে এটি তৃতীয়বার তদন্তকারী অফিসার বদলের সিদ্ধান্ত।
পুলিশের দাবি, মামলার জটিলতা এবং একাধিক ঘটনার পারস্পরিক যোগসূত্র খতিয়ে দেখতে অভিজ্ঞ আধিকারিকের প্রয়োজন ছিল। সেই কারণেই উচ্চপদস্থ আধিকারিককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্তের প্রতিটি ধাপ আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ এবং তথ্যপ্রমাণের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দু'বার বদলের পর এবার ডিএসপি স্তরের আধিকারিক
ঘটনার পরপরই বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করা হয়েছিল। প্রথম পর্যায়ে তদন্তের দায়িত্বে ছিলেন জেলা পুলিশের এক আধিকারিক। পরে তদন্তভার অন্য এক আধিকারিকের হাতে দেওয়া হয়। এবার সেই দায়িত্ব গিয়ে পৌঁছাল ডিএসপি পদমর্যাদার অফিসার শান্তনু মুখোপাধ্যায়ের কাছে।
প্রশাসনের মতে, সংবেদনশীল এই মামলার প্রতিটি তথ্য এবং ফরেন্সিক রিপোর্ট নতুন করে মূল্যায়ন করা হবে। তদন্তের কোনও অংশ যাতে উপেক্ষিত না থাকে, সে দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।
পরিবারকে দ্রুত বিচারের আশ্বাস
শনিবার নির্যাতিতার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে তিনি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের আশ্বাস দেন। প্রশাসন জানিয়েছে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনও শৈথিল্য দেখানো হবে না।
এর পরদিনই তদন্তকারী অফিসার বদলের সিদ্ধান্ত সামনে আসে। ফলে প্রশাসনের তরফে তদন্তে আরও গতি আনার বার্তা স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল হত্যাকাণ্ডেও তদন্তে অগ্রগতি
বারুইপুর কাণ্ডের জেরে ছড়িয়ে পড়া উত্তেজনার মধ্যে ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল নামে এক ব্যক্তিকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছিল। পরে তাঁর মৃত্যু হয়। তদন্তে নেমে পুলিশ ইতিমধ্যেই একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।
রবিবার আরও এক অভিযুক্ত, শামিম আলি খানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাঁর ভূমিকার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গিয়েছে। ফুটেজে আহত ইন্দ্রজিৎকে টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গিয়েছে বলেই পুলিশের দাবি।
ধৃতকে আদালতে পেশ করে হেফাজতের আবেদন জানানো হবে। তদন্তকারীদের মতে, জিজ্ঞাসাবাদে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
একসঙ্গে চলছে একাধিক তদন্ত
বারুইপুরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখন একাধিক মামলা একযোগে তদন্ত করা হচ্ছে। মূল ধর্ষণ ও খুনের মামলার তদন্ত করছে SIT। অন্যদিকে, অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনাটি আলাদা করে তদন্ত করছে সিআইডি।
এছাড়াও পুলিশের গাড়িতে হামলা, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ঘটনাগুলিও পৃথক মামলায় তদন্তাধীন রয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থাগুলির দাবি, প্রতিটি ঘটনার তথ্যপ্রমাণ আলাদাভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজিটাল, ফরেন্সিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।
ফরেন্সিক ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তে জোর
তদন্তের ক্ষেত্রে শুধু প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের উপর নির্ভর না করে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য, কল রেকর্ড, ডিজিটাল ডেটা এবং ফরেন্সিক রিপোর্টকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পুলিশের মতে, আদালতে গ্রহণযোগ্য শক্তিশালী প্রমাণ উপস্থাপনের লক্ষ্যেই এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।
তদন্তকারী দল প্রয়োজন হলে আরও সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে এবং নতুন তথ্য মিললে অতিরিক্ত গ্রেপ্তারিও হতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
প্রশাসনের বার্তা
পুলিশের বক্তব্য, বারুইপুরের ঘটনায় যে সব অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, প্রতিটি ঘটনার তদন্ত পৃথকভাবে হলেও সামগ্রিক পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। কোনও অপরাধীকে আইনের বাইরে রাখা হবে না এবং নিরপরাধ কাউকেও অযথা হয়রানি করা হবে না—এই নীতিতেই তদন্ত এগোচ্ছে।
প্রশাসনের আশা, নতুন তদন্তকারী অফিসারের নেতৃত্বে তদন্ত আরও দ্রুত এগোবে এবং আদালতে শক্তিশালী চার্জশিট পেশ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গণপিটুনি, হিংসা এবং এনকাউন্টার-সহ সংশ্লিষ্ট সব ঘটনার প্রকৃত তথ্য সামনে আনতেও তদন্তকারী সংস্থাগুলি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।



