গোপন আস্তানায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার
বহুদিন ধরেই দেবরাজ চক্রবর্তীর খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছিল তদন্তকারী সংস্থাগুলি। বিভিন্ন মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত এগোনোর পর থেকেই তিনি প্রকাশ্যে আসছিলেন না। অবশেষে বুধবার পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে একটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে তাঁকে আটক করা হয়।
অভিযানে অংশ নেয় পশ্চিমবঙ্গের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) এবং বিধাননগর পুলিশ কমিশনারেটের বিশেষ দল। দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারির পর তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করে এই অভিযান চালানো হয় বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি।
প্রযুক্তির সাহায্যে মিলেছিল অবস্থানের সূত্র
তদন্তকারীদের দাবি, দেবরাজ চক্রবর্তীর পুরুলিয়ার বাঘমুণ্ডি ও অযোধ্যা পাহাড় এলাকায় একাধিক পরিচিত যোগাযোগ ছিল। স্থানীয় স্তরে কিছু রাজনৈতিক পরিচিতির সূত্র ধরেও তাঁর গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
এর পাশাপাশি মোবাইল ফোন ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তাঁর সম্ভাব্য অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। এরপরই পরিকল্পিতভাবে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।
আদালতে আইনি সুরক্ষা না মেলার পর থেকেই ছিলেন আত্মগোপনে
সম্প্রতি কলকাতা হাই কোর্টে গ্রেপ্তার এড়াতে আবেদন করেছিলেন দেবরাজ চক্রবর্তী। প্রথমদিকে কিছুটা আইনি স্বস্তি পেলেও পরবর্তী পর্যায়ে আদালত সেই সুরক্ষা বহাল রাখেনি।
এরপর থেকেই তিনি কার্যত আড়ালে চলে যান বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি। বিভিন্ন সম্ভাব্য জায়গায় তল্লাশি চালিয়েও তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড় সংলগ্ন এলাকায় তাঁর অবস্থান নিশ্চিত হয়।
কোন মামলায় তদন্তের মুখে?
দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগে তদন্ত চলছে।
কেষ্টপুরের এক প্রোমোটার বাগুইআটি থানায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু হয়।
এছাড়াও তোলাবাজি, জমি সংক্রান্ত অনিয়ম, সিন্ডিকেট পরিচালনা এবং বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে তদন্তকারী সংস্থার দাবি।
শুধু তাই নয়, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর সংঘটিত হিংসার কয়েকটি মামলাতেও তাঁর নাম উঠে এসেছে বলে তদন্ত সূত্রে জানা গিয়েছে।
আর্থিক লেনদেন নিয়েও তদন্ত
তদন্তকারী সংস্থার দাবি, দেবরাজ চক্রবর্তী এবং তাঁর স্ত্রীকে ঘিরে একাধিক আর্থিক লেনদেন নিয়েও অনুসন্ধান চলছে।
আয়বহির্ভূত সম্পত্তি অর্জনের অভিযোগের পাশাপাশি অর্থপাচারের সম্ভাব্য দিকও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিভিন্ন আর্থিক নথি, সম্পত্তির হিসাব এবং ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য ইতিমধ্যেই সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
তদন্তকারীরা মনে করছেন, গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এই বিষয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতন
উত্তর ২৪ পরগনার রাজারহাট-গোপালপুর এলাকার বাসিন্দা দেবরাজ চক্রবর্তী প্রথম জীবনে যুব তৃণমূলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
২০১৩ সালে পুরসভার উপনির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও দলীয় মনোনয়ন পাননি। ২০১৫ সালেও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
এরপর তিনি কংগ্রেসে যোগ দিয়ে বিধাননগর পুরনিগমের ৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন।
পরবর্তীতে আবার তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরে আসেন। এরপর এলাকায় তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
স্ত্রী অদিতি মুন্সির রাজনৈতিক উত্থান
দেবরাজ চক্রবর্তীর স্ত্রী অদিতি মুন্সিও পরবর্তীকালে সক্রিয় রাজনীতিতে আসেন।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজারহাট-গোপালপুর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে তিনি বিধায়ক হন। সেই সময় থেকেই দম্পতির রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।
তদন্তকারীদের দাবি, বর্তমানে যে আর্থিক ও প্রশাসনিক অভিযোগগুলির তদন্ত চলছে, তার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু নথিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জিজ্ঞাসাবাদে মিলতে পারে নতুন তথ্য
দেবরাজ চক্রবর্তীকে বৃহস্পতিবার আদালতে তোলা হবে। তদন্তকারী সংস্থা তাঁর হেফাজতের আবেদন করতে পারে বলে সূত্রের খবর।
তদন্তকারীদের মতে, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার সময় কারা তাঁকে সাহায্য করেছেন, কোথায় কোথায় তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং তদন্তের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে আরও তথ্য জানতেই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
এছাড়াও তাঁর আর্থিক লেনদেন, সম্পত্তির উৎস এবং বিভিন্ন মামলার সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসূত্র নিয়েও বিস্তারিত জেরা হতে পারে।
দীর্ঘদিনের খোঁজাখুঁজির পর এই গ্রেপ্তার তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দিতে পারে বলেই মনে করছে তদন্তকারী মহল।



