মুকুন্দপুরের ১০৯ নম্বর ওয়ার্ড অফিসকে কেন্দ্র করে সোমবার থেকেই রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। স্থানীয়দের একাংশের বিক্ষোভের জেরে ওই কার্যালয়কে ঘিরে শুরু হয় ব্যাপক চর্চা। অভিযোগ ওঠে, অফিসের ভিতর থেকে নগদ অর্থ, একাধিক বাক্স এবং কিছু আপত্তিকর সামগ্রী উদ্ধার হয়েছে। পাশাপাশি প্রোমোটারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের একটি কথিত রেট-তালিকাও পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি করা হয়।
এই আবহেই মঙ্গলবার নতুন অভিযোগ সামনে আনে বিজেপি। বিরোধী শিবিরের দাবি, ওয়ার্ড অফিসের ভিতর থেকে কয়েকটি সিল করা খাম এবং এমন কিছু নথি উদ্ধার হয়েছে, যাতে কলকাতা পুরসভায় নিয়োগের সুপারিশের উল্লেখ রয়েছে। বিজেপি নেতাদের অভিযোগ, ওই কার্যালয়ে নিয়মিত বৈঠক হতো এবং সেখানে পুরসভার বিভিন্ন পদে কারা সুযোগ পাবেন, তা নিয়ে আলোচনা ও তালিকা প্রস্তুত করা হতো।
বিজেপির এক স্থানীয় নেতার দাবি, নির্দিষ্ট কয়েকজনকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, যোগ্যতার নিরিখে নয়, বরং রাজনৈতিক আনুগত্য এবং ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে কিছু নাম সুপারিশ করা হয়েছে। এই অভিযোগ সামনে আসার পরই কলকাতা পুরসভার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
তবে এই সমস্ত অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই বলে দাবি করেছেন ১০৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, যে জায়গাকে কেন্দ্র করে এত বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি মূলত কলকাতা পুরসভার অফিস। সেখানে সরকারি নথি, ফাইল এবং কাগজপত্র থাকাটাই স্বাভাবিক। সেগুলিকে অন্যভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও তাঁর অভিযোগ।
এক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় অনন্যা বলেন, তিনি ৮ জুনের পর ওই অফিসে যাননি। এমনকি ওই কার্যালয়ের চাবিও তাঁর কাছে নেই বলে দাবি করেন তিনি। ফলে কী উদ্ধার হয়েছে বা কী অবস্থায় নথিগুলি সেখানে ছিল, সে বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই বলেই জানিয়েছেন তৃণমূল কাউন্সিলর।
তাঁর আরও দাবি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গোটা ঘটনাকে বড় করে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রশাসনিক অফিসে বিভিন্ন ধরনের নথি থাকতেই পারে, কিন্তু তা থেকে দুর্নীতির অভিযোগ টানা যুক্তিযুক্ত নয়।
এদিকে ঘটনাকে হাতিয়ার করে রাজ্য সরকার এবং তৃণমূলের বিরুদ্ধে আক্রমণ আরও তীব্র করেছে বিজেপি। দলের বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষ বলেন, নতুন প্রশাসন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে বদ্ধপরিকর। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষ নানা ধরনের অত্যাচার ও অনিয়মের শিকার হয়েছেন। সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পদক্ষেপ শুরু হয়েছে এবং যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
বিজেপির প্রাক্তন সাংসদ রূপা গাঙ্গুলিও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে, যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলেও মত প্রকাশ করেন তিনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নিয়োগ-সংক্রান্ত এই নতুন অভিযোগ কলকাতা পুরসভাকে ঘিরে বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। যদিও এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের তরফে এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি। তদন্তে কী তথ্য সামনে আসে, তার উপরই নির্ভর করবে পরবর্তী পরিস্থিতি।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, মুকুন্দপুরের ১০৯ নম্বর ওয়ার্ড অফিসকে ঘিরে যে বিতর্ক শুরু হয়েছে, তা আপাতত থামার কোনও লক্ষণ নেই। নগদ অর্থ উদ্ধারের অভিযোগ থেকে শুরু করে কথিত নিয়োগ-তালিকা— প্রতিটি নতুন দাবি রাজ্যের রাজনৈতিক তরজাকে আরও উস্কে দিচ্ছে। এখন নজর প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং সম্ভাব্য তদন্তের দিকেই।



