রাজ্যের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ক্যালেন্ডারে রথযাত্রা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে গ্রাম থেকে শহর—পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে শতবর্ষ প্রাচীন রথযাত্রা কমিটিগুলি এই ঐতিহ্য বহন করে আসছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। সেই ঐতিহ্যকে আরও সুসংহত ও উৎসবমুখর করে তুলতেই এবার বড় আর্থিক সহায়তার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য প্রশাসন।
নবান্ন সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজ্যের যেসব রথযাত্রা কমিটির বয়স ১০০ থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে, তাদের প্রত্যেককে ৫ লক্ষ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে। এই অর্থ মূলত উৎসব পরিচালনা, রথ সংস্কার, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, এবং ভক্তদের সুবিধার্থে ব্যবহারের জন্য বরাদ্দ করা হবে। ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট পুরনো কমিটিগুলিকে শনাক্ত করার জন্য একটি বিস্তারিত তালিকা প্রস্তুত করতে।
প্রশাসনিক সূত্রে আরও জানা যায়, এই অনুদান শুধুমাত্র আর্থিক সহায়তা নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী উৎসবগুলিকে সরকারি স্বীকৃতি ও সুরক্ষা দেওয়ার একটি প্রচেষ্টাও বটে। বহু জায়গায় রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়। তাই এই ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যও রয়েছে।
নবান্নের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ১৩ জুলাই এই অনুদানের চেক আনুষ্ঠানিকভাবে কমিটিগুলির হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে। যদিও এই অনুষ্ঠান ভার্চুয়ালি পরিচালিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে, যেখানে মুখ্যমন্ত্রী নিজে উপস্থিত থেকে বিভিন্ন কমিটির প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বার্তা দিতে পারেন। প্রশাসনিক স্তরে এই প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
একইসঙ্গে রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর জেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছে, আসন্ন রথযাত্রা উপলক্ষে সমস্ত প্রস্তুতি আগে থেকেই সেরে ফেলতে হবে। বিশেষ করে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, রুট পরিকল্পনা, জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি জেলায় পুলিশ, স্বাস্থ্য দপ্তর, দমকল, পুরসভা ও পঞ্চায়েতকে একসঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রতিটি জেলায় সেবা শিবির বা ফ্যাসিলিটেশন ক্যাম্প স্থাপনের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এসব শিবিরে ভক্তদের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জল, প্রাথমিক চিকিৎসা, ওআরএস, তথ্য সহায়তা কেন্দ্র এবং প্রবীণ ও বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য আলাদা সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হবে। প্রশাসনের মতে, এই উদ্যোগ ভক্তদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করবে।
আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, একই ধরনের পরিষেবা উল্টোরথের দিনও চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শুধু মূল রথযাত্রা নয়, পুরো উৎসবকালীন সময়জুড়ে সরকারি পরিষেবার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চাইছে প্রশাসন।
প্রতিটি জেলার জন্য আলাদা করে এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে শুধুমাত্র এই সেবা শিবির পরিচালনার জন্য। তবে কোনও কমিটি যদি ঐতিহাসিক গুরুত্ব, জনসমাগম বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে অতিরিক্ত অর্থ সহায়তার প্রয়োজন মনে করে, তাহলে জেলা প্রশাসন সেই অনুযায়ী সুপারিশ পাঠাতে পারবে নবান্নে।
নবান্নের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, রথযাত্রার রুট এবং জনসমাগমস্থলে সরকারি প্রকল্প ও পরিষেবা সম্পর্কে প্রচার চালাতে হবে। একই সঙ্গে ভক্তদের সচেতন করার জন্য বিভিন্ন প্রচারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে ভিড়ের মধ্যে কোনো বিশৃঙ্খলা না তৈরি হয়।
উৎসব শেষে জেলা প্রশাসনকে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে, যেখানে থাকবে খরচের হিসাব, ব্যবহৃত অনুদানের বিবরণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আয়োজিত কর্মসূচির ছবি ও তথ্য। এই রিপোর্ট দ্রুত তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক মহলের মতে, এই ধরনের উদ্যোগের ফলে একদিকে যেমন প্রাচীন রথযাত্রা কমিটিগুলি আর্থিকভাবে উপকৃত হবে, অন্যদিকে উৎসবের আয়োজন আরও সুশৃঙ্খল ও আধুনিক ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরিত হবে।
স্থানীয় স্তরে ইতিমধ্যেই এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন বহু কমিটির সদস্যরা। তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকট ও প্রশাসনিক সহযোগিতার অভাবে অনেক ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা আয়োজন কষ্টসাধ্য হয়ে উঠছিল। এই অনুদান সেই সমস্যা অনেকটাই কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, অনুদান বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও সঠিক তালিকা প্রস্তুত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শতবর্ষ প্রাচীন কমিটি চিহ্নিত করা সহজ কাজ নয়, এবং স্থানীয় স্তরে বিভিন্ন দাবি ও প্রতিদাবি উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, রাজ্যের এই সিদ্ধান্ত রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে শুধু ধর্মীয় আবেগ নয়, প্রশাসনিক প্রস্তুতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ মেলবন্ধন তৈরি করছে বলেই মত বিশ্লেষকদের।



