সোমবার বিকেলের পর থেকেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের নতুন সমীকরণ। বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘আসল’ তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও পরে সেই খবর নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয় এবং বিষয়টি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসে।
তবে এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে বিভাজন এখন আর শুধুমাত্র মতপার্থক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তা ক্রমশ পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতার লড়াইয়ের রূপ নিচ্ছে।
মাত্র এক মাস আগেও পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল কালীঘাটের নেতৃত্ব। সেই সিদ্ধান্ত ঘিরে দীর্ঘ টানাপোড়েনও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে যায়। ঋতব্রতের নেতৃত্বে দলের একটি বড় অংশ কালীঘাট শিবির থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের ‘আসল’ তৃণমূল হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করে।
নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই ঘাসফুল শিবিরে অসন্তোষ বাড়ছিল বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি। সেই ক্ষোভের জেরে একের পর এক জনপ্রতিনিধি ও নেতার অবস্থান বদলাতে শুরু করে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন ৬৪ জনেরও বেশি বিধায়ক বলে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে বিধানসভায় পরিষদীয় দলের উপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিয়ন্ত্রণ কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে।
লোকসভা স্তরেও একই ছবি দেখা গিয়েছে। দলের বহু সাংসদ অন্য রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়ায় কালীঘাট শিবিরের সাংগঠনিক শক্তি আরও কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও এই ভাঙনের প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন পুর ও সংগঠনিক স্তরে মমতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একাধিক নেতা এখন ঋতব্রত শিবিরের সঙ্গে রয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আরও রাজনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সেই লক্ষ্যেই সোমবার নিউটাউনের একটি পাঁচতারা হোটেলে বিশেষ অধিবেশনের আয়োজন করা হয়। সেখানে দলের নতুন সাংগঠনিক কাঠামো প্রকাশ্যে আনা হয়।
এই নতুন কাঠামোয় হাওড়া মধ্যের বিধায়ক অরূপ রায়কে ‘আসল’ তৃণমূলের চেয়ারপার্সন ঘোষণা করা হয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যান পদে রাখা হয়েছে ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস এবং রথীন ঘোষকে। একইসঙ্গে জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সাবিনা ইয়াসমিনকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন এই নেতৃত্ব কাঠামোয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও ভূমিকা রাখা হয়নি। ফলে রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কালীঘাটের মূল নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ অবস্থান কী হতে চলেছে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; বরং তৃণমূল কংগ্রেসের পরিচয়, প্রতীক এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণের লড়াইয়ের নতুন অধ্যায়। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাধ্যমে গড়ে তোলা দলকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে বিদ্রোহী শিবির নিজেদেরই প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাসপেন্ড করার খবর পরে ধোঁয়াশার মধ্যে পড়লেও তার রাজনৈতিক অভিঘাত কম নয়। কারণ, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে দুই শিবিরের সংঘাত এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে প্রতীকী পদক্ষেপও বড় রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।
আগামী দিনে এই দ্বন্দ্ব সাংগঠনিক ও আইনি লড়াইয়ের দিকে আরও এগোতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। আপাতত রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন একটাই—তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কার হাতে থাকবে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেবে।



