রাজ্যের শাসকদলের অভ্যন্তরীণ সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠল সোমবার। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘আসল’ তৃণমূলের বিশেষ অধিবেশন এবং নতুন কমিটি গঠনের পরই কালীঘাটের তৃণমূল নেতৃত্ব একাধিক প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে শোকজ নোটিস জারি করেছে। সেই তালিকায় রয়েছেন ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, জাভেদ খান, রথীন ঘোষ, বিপ্লব মিত্র, স্নেহাশিস চক্রবর্তী, সাবিনা ইয়াসমিন-সহ আরও কয়েকজন নেতা।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি শুধুমাত্র সাংগঠনিক শৃঙ্খলাভঙ্গের প্রশ্ন নয়; বরং তৃণমূলের ভিতরে ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ে টানাপোড়েনের বহিঃপ্রকাশ। কারণ, যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে দলের প্রথম সারির মুখ হিসেবে পরিচিত। তাঁদের একটি অংশ অতীতে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলেই রাজনৈতিক মহলে পরিচিত ছিলেন।
সোমবার বিকেলে নিউটাউনের একটি পাঁচতারা হোটেলে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে ‘আসল’ তৃণমূলের বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা একাধিক কাউন্সিলর এবং দলীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে নতুন জাতীয় কর্মসমিতির ঘোষণা করা হয়। উপস্থিত নেতাদের মধ্যে এমন কিছু মুখও ছিলেন, যাঁদের উপস্থিতি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বৈঠকে যোগদানকারী নেতাদের মধ্যে ছিলেন কলকাতার ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর সৌরভ বসু। পাশাপাশি, নতুন কমিটিতে অরূপ রায়কে চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব দেওয়ার ঘোষণাও বিশেষভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ‘আসল’ তৃণমূল শুধুমাত্র একটি প্রতিবাদী গোষ্ঠী হয়ে থাকতে চাইছে না; বরং তারা নিজেদের একটি বিকল্প সাংগঠনিক কাঠামো হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে।
দলের ভেতরে অস্থিরতার সূত্রপাত হওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুরনো সাংগঠনিক কমিটিগুলি ভেঙে নতুন করে বিভিন্ন কমিটি গঠন করেছিলেন। শৃঙ্খলারক্ষা কমিটিও নতুন করে সাজানো হয়। উদ্দেশ্য ছিল, অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়ে দিচ্ছে, সেই উদ্যোগেও অন্দরের অসন্তোষ পুরোপুরি থামানো সম্ভব হয়নি।
দলীয় সূত্রের খবর, ‘আসল’ তৃণমূলের কার্যক্রমে অংশ নেওয়া এবং বিকল্প সাংগঠনিক মঞ্চে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়াকেই কালীঘাট শিবির দলবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। সেই কারণেই সংশ্লিষ্ট নেতাদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে শোকজ নোটিস পাঠানো হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাঁদের জবাব দিতে বলা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বাড়িয়েছে কিছু পরিচিত নামের উপস্থিতি। ফিরহাদ হাকিম এবং অরূপ বিশ্বাস দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের অন্যতম প্রভাবশালী সংগঠক হিসেবে পরিচিত। জাভেদ খানও দলের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। অন্যদিকে, প্রাক্তন মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী আগে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিলেও বর্তমানে তাঁর নামও ‘আসল’ তৃণমূলের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ায় নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এদিন ইঙ্গিত দিয়েছেন, আগামী দিনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ নেতা তাঁদের শিবিরে যোগ দিতে পারেন। ফলে কালীঘাটের নেতৃত্বের সামনে সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই মুহূর্তে তৃণমূলের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, দলের ঐক্য কীভাবে বজায় রাখা হবে। কারণ, একদিকে নতুন শিবির নিজেদের শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে মূল সংগঠন শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে কড়া অবস্থান নিচ্ছে। এই দ্বন্দ্ব আগামী দিনে আরও বিস্তৃত রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি দলীয় বিরোধ নয়; বরং বাংলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিতও বহন করছে। এখন দেখার, শোকজের জবাবে সংশ্লিষ্ট নেতারা কী অবস্থান নেন এবং দলীয় নেতৃত্ব পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।



