আরজি কর তদন্তে নতুন পদক্ষেপ, সিবিআইয়ের ডাকে হাজির তিন শীর্ষ পুলিশকর্তা
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের রহস্যমৃত্যু ও ধর্ষণ-খুন মামলার তদন্তে আরও এক ধাপ এগোল সিবিআই। শুক্রবার কলকাতার সিজিও কমপ্লেক্সে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দফতরে উপস্থিত হন কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন কমিশনার বিনীত গোয়েল, আইপিএস অফিসার ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় এবং অভিষেক গুপ্ত। তদন্তকারী সূত্রের খবর, তিন জনেরই বয়ান আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করা হয়েছে।
২০২৪ সালের অগস্ট মাসে আরজি কর হাসপাতালের সেমিনার হল থেকে উদ্ধার হয়েছিল এক তরুণী চিকিৎসকের দেহ। অভিযোগ ওঠে, তাঁকে ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে শুরু হয় বিক্ষোভ, পথে নামেন চিকিৎসক সমাজ থেকে সাধারণ মানুষ। সেই সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
ঘটনার সময়ে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (সেন্ট্রাল) পদে কর্মরত ছিলেন। অন্যদিকে অভিষেক গুপ্ত ছিলেন ডিসি (নর্থ)। কলকাতা পুলিশের সর্বোচ্চ পদে ছিলেন বিনীত গোয়েল। তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে এই তিন পুলিশ আধিকারিকের সিদ্ধান্ত ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন প্রশাসন কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে এই তিন আইপিএস আধিকারিককে সাময়িক বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারিভাবে জানানো হয়, আরজি কর-কাণ্ডের তদন্তে নানা অসংগতি এবং দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে।
আরজি কর-কাণ্ড সামনে আসার পর কলকাতা পুলিশের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উঠেছিল। অভিযোগ ছিল, নির্যাতিতার পরিচয় প্রকাশ্যে চলে আসে। একই সঙ্গে ঘটনার তদন্ত ও তথ্যপ্রকাশের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর বার্তা দেওয়া হয়েছিল বলেও সমালোচনা হয়। হাসপাতাল চত্বরে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী চক্রকে আড়াল করার অভিযোগও ওঠে। এই সমস্ত কারণেই তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল নাগরিক সমাজের একাংশে।
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার প্রথম দিকে পুলিশ কর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সাড়া দেয়নি। আন্দোলনরত চিকিৎসক ও সাধারণ নাগরিকদের তরফে বারবার পুলিশ কমিশনার বিনীত গোয়েলের অপসারণের দাবি জানানো হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। পরে অবশ্য তাঁকে কলকাতা পুলিশের কমিশনার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও বিতর্কের অবসান হয়নি।
এরই মধ্যে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মামলার তদন্তভার সিবিআইয়ের হাতে যায়। তদন্তের অগ্রগতিতে তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডলকে। সেই গ্রেপ্তারির পর থেকেই পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আরও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
তদন্ত চলাকালীন একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করেও নতুন বিতর্কের জন্ম হয়েছিল। অভিযোগ ওঠে, চিকিৎসকের দেহ উদ্ধারের পরে হাসপাতালের সেমিনার হলে বহিরাগতসহ বহু মানুষের প্রবেশ ঘটেছিল। ঘটনাস্থলের নিরাপত্তা এবং ফরেন্সিক প্রমাণ সংরক্ষণ নিয়ে তখন উদ্বেগ তৈরি হয়।
সেই সময় সাংবাদিক বৈঠকে ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি সেমিনার হলেরই অংশের। তবে যেখানে মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছিল, সেই নির্দিষ্ট জায়গাটি পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে ছিল বলে দাবি করেন তিনি। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্যে অনেকেই সন্তুষ্ট হননি। বরং তথ্য গোপনের অভিযোগ আরও জোরালো হয়।
অন্যদিকে অভিষেক গুপ্তের নামও একাধিক বিতর্কে উঠে আসে। অভিযোগ ছিল, ঘটনার পর সেমিনার হলের পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার বিষয়ে যথাযথ নজরদারি হয়নি। ‘রাতদখল’ কর্মসূচির সময় হাসপাতালে ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এছাড়া নির্যাতিতার পরিবারের তরফে ক্ষতিপূরণের নামে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাবের অভিযোগ সামনে আসার পর সমাজমাধ্যমে নতুন করে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাচক্রে, চিকিৎসকের মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার সময় যে পুলিশি দলে অভিষেক গুপ্ত উপস্থিত ছিলেন, সেই তথ্যও আলোচনায় আসে।
এই প্রেক্ষাপটে সিবিআইয়ের তরফে তিন নিলম্বিত আইপিএস অফিসারকে ডেকে পাঠানোকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তদন্তকারী সংস্থা তাঁদের কাছ থেকে ঘটনাক্রম, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন সময়ে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়েছে বলে সূত্রের খবর।
তদন্ত এখনও চলমান। সিবিআইয়ের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও মন্তব্য না করা হলেও, আরজি কর-কাণ্ডের বিভিন্ন অসংগতি ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে তথ্য উঠে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রায় দুই বছর পরও এই ঘটনার তদন্ত ঘিরে জনমানসে আগ্রহ ও সংবেদনশীলতা একইরকম রয়েছে। ফলে তিন প্রাক্তন শীর্ষ পুলিশকর্তার বয়ান তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।



