সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে অসন্তোষের সুর। ভোটে ধাক্কা খাওয়ার পর দলের বিভিন্ন স্তরে ক্ষোভ ও অভিমানের বহিঃপ্রকাশ দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এই ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়নি দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বরং দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের বড় অংশই কেন্দ্রীভূত হয়েছে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে।
দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, বিধায়ক দল, সংসদীয় দল কিংবা কলকাতা পুরসভার কাউন্সিলরদের একাংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অসন্তোষ এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। একাধিক নেতা বিভিন্ন প্রসঙ্গে অভিযোগ তুলছেন এবং তাঁদের বক্তব্যে অভিষেকের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠে আসছে।
দলের প্রবীণদের একাংশের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে সংগঠনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের মতামত যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। পাশাপাশি দলীয় স্তরে কিছু সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও তাঁদের দাবি। সংগঠনের কার্যপদ্ধতি, নেতৃত্বের ধরন এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে অন্দরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে।
প্রথম দিকে যাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের অনেকেই তুলনামূলকভাবে পরে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তাঁদের অসন্তোষকে অনেকেই ক্ষমতার সমীকরণ বদলের প্রেক্ষিতে দেখছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি অন্য মাত্রা পায় যখন দলের দীর্ঘদিনের এবং প্রতিষ্ঠালগ্নের সঙ্গে যুক্ত নেতারাও প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন।
এই তালিকায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা হিসেবে পরিচিত। দলের কঠিন সময়ে তিনি বারবার নেতৃত্বের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং রাজনৈতিক লড়াইয়ে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন। সেই নেতার মুখে অভিষেককে ঘিরে ক্ষোভের কথা সামনে আসায় তৃণমূলের অন্দরের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করে জানান, তিনি নিজেকে সৎভাবে রাজনীতি করেও নানা অভিযোগের মুখে পড়ছেন। তাঁর বক্তব্যে দলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে হতাশার ইঙ্গিত মিলেছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই ধরনের মন্তব্য শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং দলের একাংশের বৃহত্তর অস্বস্তির প্রতিফলনও হতে পারে।
শুধু কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ই নন, তৃণমূলের প্রবীণ নেতাদের একাংশের মধ্যেও অভিষেককে ঘিরে অস্বস্তির কথা শোনা যাচ্ছে। রাজনৈতিক মহলে আলোচনায় উঠে এসেছে আরও কয়েকজন অভিজ্ঞ নেতার নাম, যাঁদের একাংশের মতে, বর্তমান সাংগঠনিক পরিস্থিতি নিয়ে পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
এই অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা। দলের অন্দরে ক্ষোভ বাড়লেও তিনি এখনও প্রকাশ্যে কোনও সাংগঠনিক রদবদলের ইঙ্গিত দেননি। বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরানো বা তাঁর ভূমিকা পুনর্মূল্যায়নের কোনও উদ্যোগ এখনও সামনে আসেনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এর পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় গত কয়েক বছরে তৃণমূলের সাংগঠনিক ও নির্বাচনী কৌশলের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন। দ্বিতীয়ত, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন বলে দলীয় একাংশের ধারণা। ফলে এই মুহূর্তে তাঁর বিরুদ্ধে কোনও কঠোর পদক্ষেপ নিলে দলের সাংগঠনিক কাঠামোয় আরও অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, সমালোচকদের মতে, নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এত বিস্তৃত অসন্তোষ প্রকাশ্যে চলে আসার পরও কোনও পদক্ষেপ না নেওয়ায় ভুল বার্তা যেতে পারে। তাঁদের দাবি, দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে তা ভবিষ্যতে আরও বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
এই আবহে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, দলের সামনে এখন বড় রাজনৈতিক লড়াই রয়েছে এবং সেই পরিস্থিতিতে পারস্পরিক বোঝাপড়া জরুরি। তাঁর বক্তব্যে বিরোধের পাশাপাশি সমাধানের সম্ভাবনাও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
অন্যদিকে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তাঁর সমালোচনা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। একইসঙ্গে তিনি প্রবীণ নেতার প্রতি নিজের শ্রদ্ধার কথাও উল্লেখ করেছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই প্রতিক্রিয়ায় বিরোধের পরিস্থিতি আরও জটিল না করে সংলাপের পথ খোলা রাখার চেষ্টা দেখা গিয়েছে।
দলীয় অন্দরের এই টানাপোড়েনের মধ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীরবতা এখন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন, নাকি উপযুক্ত সময়ের অপেক্ষায় রয়েছেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে এটা স্পষ্ট যে, দলের অন্দরে জমে ওঠা ক্ষোভকে সামাল দেওয়া আগামী দিনে তাঁর অন্যতম বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তৃণমূলের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ। একদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মোকাবিলা, অন্যদিকে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ প্রশমিত করা। এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কী কৌশল নেন এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।



