সাত বছর পর ভারতের মাটিতে শি
দীর্ঘ সাত বছর পর ভারতে এলেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। শনিবার দুপুরে বিশেষ বিমানে দিল্লিতে পৌঁছন তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন চিনা কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা কাই কি এবং দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ওয়াং ই।
দিল্লি বিমানবন্দরে চিনা প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতিন প্রসাদা। এরপর নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর আলোচনায় বসার কথা।
শির এই সফর শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য নয়। ভারত ও চিনের মধ্যে গত কয়েক বছরে তৈরি হওয়া অবিশ্বাস এবং সীমান্ত উত্তেজনার পর তাঁর দিল্লি সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
শেষবার এসেছিলেন ২০১৯ সালে
ভারতে শি জিনপিংয়ের শেষ সফর হয়েছিল ২০১৯ সালে। তারপর থেকে নয়াদিল্লি ও বেজিংয়ের সম্পর্ক একাধিক সংকটের মধ্য দিয়ে গিয়েছে।
২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষ দুই দেশের সম্পর্কে গভীর প্রভাব ফেলে। সীমান্তে ভারতীয় ও চিনা সেনার মুখোমুখি অবস্থান এবং প্রাণহানির ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরে উত্তেজনা বজায় ছিল।
এর আগে ডোকলাম নিয়েও দুই দেশের মধ্যে তীব্র সামরিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। পাশাপাশি অরুণাচল প্রদেশকে কেন্দ্র করে চিনের দাবি ও ভারতের আপত্তি নিয়ে কূটনৈতিক টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে শির দিল্লি সফর এবং মোদির সঙ্গে তাঁর সরাসরি বৈঠক স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সীমান্ত সমস্যাই কি বৈঠকের মূল বিষয়?
দুই রাষ্ট্রনেতার আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির একটি হতে পারে সীমান্ত পরিস্থিতি। গত কয়েক বছরে সামরিক ও কূটনৈতিক স্তরে একাধিক দফায় আলোচনা হলেও ভারত-চিন সীমান্ত প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান এখনও হয়নি।
সীমান্তে শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখা ভারতের কাছে বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। নয়াদিল্লির অবস্থান, সীমান্তে শান্তি না থাকলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অন্যান্য ক্ষেত্রেও স্বাভাবিক অগ্রগতি কঠিন।
ফলে মোদি-শি বৈঠকে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পরিস্থিতি, সেনা মোতায়েন, সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ আরও কার্যকর করার বিষয় উঠতে পারে।
তবে এই বৈঠকেই দীর্ঘদিনের সীমান্ত সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা এখনই করা ঠিক হবে না। বরং আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ককে স্থিতিশীল করার কোনও নতুন পথ তৈরি হয় কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।
গালওয়ানের ক্ষত কতটা শুকিয়েছে?
গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত-চিন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় পারস্পরিক আস্থার সংকট।
সীমান্তে উত্তেজনা কমানোর জন্য পরবর্তী সময়ে সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে একাধিক আলোচনা হয়েছে। কিছু এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতিও হয়েছে। কিন্তু গালওয়ানের স্মৃতি এবং সীমান্ত নিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের মতবিরোধ এখনও সম্পর্কের উপর ছায়া ফেলছে।
মোদির সঙ্গে শির বৈঠকে তাই শুধু বর্তমান পরিস্থিতি নয়, ভবিষ্যতে সীমান্তে কোনও নতুন সংঘর্ষ যাতে না ঘটে, সেই বিষয়ে আস্থাবর্ধক ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানো এবং সামরিক পর্যায়ে দ্রুত সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থা তৈরি করাও আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
বাণিজ্যেও নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা
সীমান্তের পাশাপাশি ভারত ও চিনের বিপুল বাণিজ্যিক সম্পর্কও আলোচনায় আসতে পারে।
রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক নির্ভরতা পুরোপুরি শেষ হয়নি। ভারতের বাজারে চিনা পণ্যের উপস্থিতি যেমন রয়েছে, তেমনই ভারতীয় শিল্পের বেশ কিছু ক্ষেত্র চিনা সরবরাহ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল।
তাই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ভারসাম্য, আমদানি-রফতানি, বিনিয়োগ এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে দুই নেতা আলোচনা করতে পারেন।
সীমান্তে উত্তেজনা কমলে অর্থনৈতিক সম্পর্কেও ধীরে ধীরে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ।
সরাসরি বিমান পরিষেবা নিয়েও আলোচনা
দুই দেশের সাধারণ মানুষের যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে সমস্যা রয়েছে। করোনা পরবর্তী সময়ে ভারত ও চিনের মধ্যে সরাসরি বিমান পরিষেবা স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লেগেছে।
দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হলে সরাসরি বিমান যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ব্যবসায়ী, পর্যটক, শিক্ষার্থী এবং দুই দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত মানুষের যাতায়াত সহজ করতে সরাসরি বিমান পরিষেবা পুনরুজ্জীবিত করার প্রয়োজন রয়েছে।
মোদি-শি বৈঠকে এই বিষয়টি উঠলে তা দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে একটি বাস্তব পদক্ষেপ হতে পারে।
চিনা দূতাবাসের বার্তায় বন্ধুত্বের সুর
শি জিনপিং দিল্লিতে পৌঁছনোর আগেই চিনের তরফে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা দেওয়া হয়েছে। চিনা রাষ্ট্রদূত জু ফেইহং সামাজিক মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত ও দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
তাঁর বক্তব্যের মূল সুর ছিল, দুই দেশের নেতৃত্বের নির্দেশনায় পারস্পরিক সমন্বয় ও সহযোগিতা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও তা যথাযথভাবে সামলানোর উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
চিনের এই বার্তা তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সীমান্ত নিয়ে মতবিরোধ থাকলেও বেজিং প্রকাশ্যে সম্পর্ককে সংঘাতের বদলে আলোচনার পথে এগিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভারতও কি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে?
নয়াদিল্লির কাছেও চিনের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। ভারত একদিকে সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে প্রতিবেশী চিনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতও চায় না।
ভারতের কূটনৈতিক নীতিতে সীমান্তে শান্তি এবং পারস্পরিক আস্থা তৈরির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে চিনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও নয়াদিল্লির অন্যতম অগ্রাধিকার।
মোদির সঙ্গে শির বৈঠক তাই কোনও একক ইস্যুর আলোচনা নয়। সীমান্তের পাশাপাশি বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং বৃহত্তর এশীয় কূটনীতিও আলোচনায় উঠে আসতে পারে।
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ
শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফর শুধু ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
চিন দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার। ভারত ও চিনের সম্পর্কের উন্নতি হলে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভারত-চিন সম্পর্কের গতিপথ গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ঢাকা বেজিং ও নয়াদিল্লি—দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় রাখে।
ফলে দিল্লি-বেজিং সম্পর্কের উন্নতি হলে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
আমেরিকার নজরও দিল্লির দিকে
ভারত-চিন সম্পর্কের সম্ভাব্য উন্নতি ওয়াশিংটনের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে ভারত ও আমেরিকার কৌশলগত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে আমেরিকা।
এই পরিস্থিতিতে ভারত যদি বেজিংয়ের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা কমিয়ে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে এগোয়, তাহলে এশিয়ার কৌশলগত সমীকরণেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এর অর্থ ভারত কোনও পক্ষের দিকে পুরোপুরি ঝুঁকে পড়বে—এমনটা বলা ঠিক হবে না। নয়াদিল্লি বরাবরই নিজের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করে এসেছে।
মোদি-শি বৈঠক থেকে কী বার্তা আসতে পারে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই বৈঠক শেষে দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে কী বার্তা আসে। সীমান্তে শান্তি বজায় রাখার বিষয়ে নতুন কোনও সমঝোতা হয় কি না, সরাসরি বিমান যোগাযোগ নিয়ে অগ্রগতি হয় কি না, কিংবা বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয় কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শুধু যৌথ বিবৃতি বা সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বাস্তবে দুই দেশ কী পদক্ষেপ নেয় সেটিই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
গালওয়ানের পর তৈরি হওয়া অবিশ্বাস দূর করতে সময় লাগবে। সীমান্ত সমস্যাও এক বৈঠকে মিটবে না। তবে শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগ যদি নিয়মিত হয় এবং মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তাহলে সম্পর্কের উন্নতির জন্য একটি নতুন ভিত্তি তৈরি হতে পারে।
নতুন অধ্যায়ের সূচনা, নাকি সাময়িক কূটনৈতিক বার্তা?
শি জিনপিংয়ের সাত বছর পর ভারত সফরকে তাই একাধিক দিক থেকে দেখা হচ্ছে। একদিকে সীমান্ত সংঘাতের স্মৃতি, অন্যদিকে বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্বার্থ—দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল।
দিল্লিতে মোদি-শি বৈঠক সেই জটিলতার মধ্যেই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলতে পারে। তবে সীমান্ত সমস্যা দ্রুত মিটে যাবে বা দুই দেশের মধ্যে পুরনো আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসবে—এমন নিশ্চয়তা এখনও নেই।
শেষ পর্যন্ত বৈঠকের পর দুই দেশের সেনা ও কূটনৈতিক স্তরে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সেটিই সবচেয়ে বড় বিষয়। আপাতত গোটা বিশ্বের নজর দিল্লিতে—মোদি ও শির আলোচনায় কি সত্যিই ভারত-চিন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়, নাকি এটি কেবল কূটনৈতিক উষ্ণতার একটি সাময়িক মুহূর্ত হয়, তার উত্তর মিলবে সময়ের সঙ্গে।



