তৃতীয় চার্জশিটে ১৯ জনের নাম
৫০৪ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের এই মামলায় তদন্ত এগিয়ে নিয়ে গিয়ে এবার তৃতীয় চার্জশিট জমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই। পঞ্চকুলার বিশেষ আদালতে পেশ করা নথিতে ১৯ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, অভিযুক্তদের তালিকায় হরিয়ানা সরকারের ছ’জন প্রাক্তন উচ্চপদস্থ আইএএস আধিকারিক রয়েছেন। সরকারি প্রশাসনের শীর্ষস্তরের এতজন আধিকারিকের বিরুদ্ধে একই ফৌজদারি মামলায় চার্জশিট জমা পড়ার ঘটনা রাজ্যে নজিরবিহীন বলে দাবি করা হয়েছে।
মামলাটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ অভিযোগের সঙ্গে হরিয়ানা সরকারের একাধিক দপ্তর ও সংস্থার তহবিল জড়িত। সিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, সরকারি অর্থ নির্দিষ্ট কয়েকটি ব্যাঙ্ক শাখায় নিয়মবহির্ভূতভাবে স্থানান্তরের পর সেই অর্থের একটি বড় অংশ ভুয়ো সংস্থার অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়েছিল বলে অভিযোগ।
চার্জশিটে থাকা ছয় আইএএস আধিকারিক কারা?
সিবিআইয়ের তৃতীয় চার্জশিটে নাম থাকা ছয় আইএএস আধিকারিক হলেন মোহাম্মদ শায়িন, সাকেত কুমার, বিনীত গর্গ, প্রদীপ কুমার, রাম কুমার সিং এবং পঙ্কজ আগরওয়াল।
মোহাম্মদ শায়িন হরিয়ানা পাওয়ার জেনারেশন কর্পোরেশনের প্রাক্তন ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন। সাকেত কুমার উন্নয়ন ও পঞ্চায়েত বিভাগের প্রাক্তন কমিশনার ও সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
বিনীত গর্গ ছিলেন হরিয়ানা স্টেট পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান। একই সংস্থার সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন প্রদীপ কুমার। তাঁকে গত জুনে অবসরের দিনই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে।
অন্যদিকে রাম কুমার সিং পঞ্চকুলার প্রাক্তন পুর কমিশনার। পঙ্কজ আগরওয়াল হরিয়ানা স্টেট এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ছিলেন।
এই ছয় আধিকারিকের নাম একই মামলায় চার্জশিটে ওঠায় প্রশাসনিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সরকারি তহবিল কীভাবে সরানো হয়েছিল?
সিবিআইয়ের অভিযোগ অনুযায়ী, হরিয়ানা সরকারের আটটি পৃথক দপ্তর ও সংস্থার তহবিলকে কেন্দ্র করে এই আর্থিক অনিয়মের জাল তৈরি হয়েছিল।
তদন্তকারীদের দাবি, অভিযুক্ত সরকারি আধিকারিকদের একাংশ ব্যাঙ্কের কিছু কর্তাব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারি অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্দিষ্ট কয়েকটি শাখায় স্থানান্তর করেছিলেন।
এরপর সেই অর্থের একটি বড় অংশ ভুয়ো বা সন্দেহজনক সংস্থার অ্যাকাউন্টে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। মোট ৫০৪ কোটি টাকা এই প্রক্রিয়ায় আত্মসাৎ করা হয়েছিল বলে তদন্তে দাবি করা হয়েছে।
সরকারি অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিয়ম, অনুমোদন এবং আর্থিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এড়িয়ে কীভাবে এত বড় অঙ্কের টাকা সরানো সম্ভব হল, সেটিও এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মামলায় অভিযুক্তের সংখ্যা বেড়ে ৩৭
তৃতীয় চার্জশিটে আরও ১৯ জনের নাম যুক্ত হওয়ার পর এই মামলায় মোট অভিযুক্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭।
এখনও পর্যন্ত তদন্তের অংশ হিসেবে সিবিআই ৫৪টি জায়গায় তল্লাশি চালিয়েছে। তদন্তকারীরা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি এবং ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহ করেছেন বলে জানা গিয়েছে।
এছাড়াও প্রায় ২০ কোটি টাকা মূল্যের সোনা উদ্ধার করা হয়েছে বলে তদন্তকারী সংস্থার সূত্রে দাবি করা হয়েছে। নগদ অর্থ, নথিপত্র, ইলেকট্রনিক ডিভাইস এবং অন্যান্য তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সিবিআইয়ের দাবি, তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই এই আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে আরও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র সামনে এসেছে। সেই কারণেই ধাপে ধাপে চার্জশিটে অভিযুক্তের সংখ্যা বেড়েছে।
২৬ জন ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার
এই মামলায় এখনও পর্যন্ত ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিবিআই। অর্থাৎ চার্জশিটে নাম থাকা প্রত্যেকেই যে হেফাজতে রয়েছেন, এমন নয়। তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গিয়েছে, তাঁদের ভূমিকা আলাদা করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা সরকারি তহবিল স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে অর্থ কোথায় গিয়েছে, কারা সেই অর্থ নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং সেই অর্থের সঙ্গে অভিযুক্তদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ ছিল কি না—সবকিছুই যাচাই করছেন।
বিশেষ করে সরকারি আধিকারিক এবং ব্যাঙ্ককর্তাদের মধ্যে যোগাযোগের ধরন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
কীভাবে প্রকাশ্যে এল ৫০৪ কোটির কেলেঙ্কারি?
এই বিশাল আর্থিক অনিয়মের ঘটনা প্রকাশ্যে আসে চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাঙ্কের প্রাক্তন কর্মী ঋভব ঋষি ও অভয় কুমারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তাঁদের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগ থাকা স্বস্তিক দেশ প্রজেক্টের স্বাতী সিঙ্গলা এবং অভিষেক সিঙ্গলাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে জানা যায়।
এই গ্রেপ্তারের পর তদন্তে একের পর এক আর্থিক লেনদেনের তথ্য সামনে আসতে শুরু করে। সরকারি দপ্তরের তহবিল, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের সূত্র ধরে তদন্তের পরিধি ক্রমশ বাড়তে থাকে।
পরবর্তীতে সরকারি আধিকারিকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সেই তদন্তেরই পরবর্তী ধাপে ছয় আইএএস আধিকারিক-সহ আরও ১৯ জনকে চার্জশিটে অভিযুক্ত করা হল।
ব্যাঙ্ককর্তাদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত
এই মামলায় শুধু সরকারি আধিকারিকদের ভূমিকা নয়, ব্যাঙ্কের কর্মী ও কর্তাদের ভূমিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখছে সিবিআই।
কারণ সরকারি তহবিলের মতো বিপুল অর্থ কীভাবে নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত হল এবং পরবর্তীতে কীভাবে সেই টাকা অন্যত্র চলে গেল, তা জানতে ব্যাঙ্কিং লেনদেনের প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা করা হচ্ছে।
তদন্তকারীরা অনুমোদন প্রক্রিয়া, লেনদেনের নথি, অ্যাকাউন্ট পরিচালনার তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে যোগাযোগের তথ্য খতিয়ে দেখছেন। কোনও জায়গায় নিয়ম ভেঙে ইচ্ছাকৃতভাবে লেনদেন করা হয়েছিল কি না, সেটিই তদন্তের অন্যতম মূল প্রশ্ন।
প্রশাসনের অন্দরমহলে বড় ধাক্কা
একসঙ্গে ছ’জন আইএএস আধিকারিকের নাম চার্জশিটে ওঠা হরিয়ানার প্রশাসনিক মহলে বড় ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সরকারি আধিকারিকদের কাজের সঙ্গে বিপুল সরকারি অর্থের নিরাপত্তা সরাসরি যুক্ত। ফলে কোনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সরকারি তহবিল অন্যত্র সরানো হয়ে থাকলে তার দায় কতটা, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
তবে চার্জশিটে নাম থাকা মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। সিবিআইয়ের অভিযোগ আদালতে বিচারাধীন থাকবে এবং অভিযুক্তরা নিজেদের বক্তব্য ও আইনি অধিকার অনুযায়ী আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাবেন।
তদন্ত কি আরও বাড়বে?
তৃতীয় চার্জশিট জমা পড়লেও তদন্ত পুরোপুরি শেষ হয়েছে কি না, তা নিয়ে আগ্রহ রয়েছে। কারণ এখনও পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ নথি ও ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের কথা জানিয়েছে সিবিআই।
৫৪টি জায়গায় তল্লাশি এবং ২৬ জনকে গ্রেপ্তারের পরও আর্থিক লেনদেনের পুরো চক্র সম্পর্কে আরও তথ্য সামনে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারি অর্থের চূড়ান্ত গন্তব্য, ভুয়ো সংস্থাগুলির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে ছিল এবং অভিযুক্তদের মধ্যে কার কী ভূমিকা ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের পরবর্তী পর্যায়ে আরও স্পষ্ট হতে পারে।
আদালতের পরবর্তী প্রক্রিয়ার দিকে নজর
চার্জশিট পেশ হওয়ার পর এখন মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া এগোবে। বিশেষ সিবিআই আদালত তদন্তকারী সংস্থার জমা দেওয়া নথি ও অভিযোগগুলি পর্যালোচনা করবে।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী কী ধারায় বিচার শুরু হবে এবং পরবর্তী সময়ে আদালতে কী তথ্যপ্রমাণ পেশ করা হয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি আধিকারিক, ব্যাঙ্ককর্মী এবং বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের মধ্যে কথিত যোগসাজশের অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হয়, তার উত্তরও বিচারপ্রক্রিয়াতেই মিলবে।
৫০৪ কোটি টাকার মামলায় নজিরবিহীন পরিস্থিতি
হরিয়ানার ইতিহাসে একই ফৌজদারি মামলায় একসঙ্গে এতজন আইএএস আধিকারিকের বিরুদ্ধে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা প্রশাসনিক স্তরে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৫০৪ কোটি টাকার এই মামলায় ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার, তল্লাশি, বিপুল সম্পত্তি উদ্ধারের মতো একাধিক পদক্ষেপ করেছে সিবিআই। এবার ছয় আইএএস-সহ আরও ১৯ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা পড়ায় তদন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছল।
তবে শেষ পর্যন্ত সরকারি তহবিল আত্মসাতের অভিযোগে কার বিরুদ্ধে কী প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটাই হবে মামলার মূল বিষয়। আপাতত নজর বিশেষ সিবিআই আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং তদন্তের ভবিষ্যৎ গতিপথের দিকে।



