রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে তৃণমূল কংগ্রেসের তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ার ঘটনা। হঠাৎ করেই দলের তিনটি অ্যাকাউন্টে সমস্ত ধরনের আর্থিক লেনদেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কার্যত চাপে পড়েছে ‘কালীঘাট তৃণমূল’। এই পরিস্থিতিতে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে তারা।
সোমবার কলকাতা হাই কোর্টে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে মামলার অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তৃণমূলের আইনজীবীরা। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করেছে। ফলে আগামী দিনে এই মামলার বিস্তারিত শুনানি শুরু হওয়ার পথ খুলে গেল।
দলের দাবি, কোনও পূর্ব নোটিস ছাড়াই তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছে। কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যাও এখনও পাওয়া যায়নি। এর ফলে দলের দৈনন্দিন আর্থিক কার্যকলাপ ব্যাহত হয়েছে এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক খাতে অর্থ বরাদ্দেও সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ।
জানা গিয়েছে, ফ্রিজ হয়ে যাওয়া তিনটি অ্যাকাউন্টে মোট প্রায় ৪৪০ কোটি টাকা রয়েছে। আপাতত ওই অ্যাকাউন্টগুলি থেকে কোনও ধরনের অর্থ তোলা, জমা করা বা অন্য কোনও লেনদেন করা যাবে না। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে যাওয়ায় রাজনৈতিক মহলেও চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
সূত্রের খবর, বিধাননগর দক্ষিণ থানায় তৃণমূলের ‘ঋতপন্থী’ শিবিরের ১০ জন বিধায়কের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তে নেমে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলি ফ্রিজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে এই ঘটনার পেছনে গত কয়েক দিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
কয়েক দিন আগে দলের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার দাবি তুলে চিঠি দিয়েছিলেন অরূপ বিশ্বাস। তাঁর বক্তব্য ছিল, দলের আর্থিক লেনদেন নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠছে এবং সেই কারণে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন।
অরূপ বিশ্বাসের অবস্থানকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেন দলের আরেক নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, দলের অ্যাকাউন্টে কী ধরনের অর্থ রয়েছে এবং সেই অর্থের উৎস কী, তা নিয়ে তদন্ত হওয়া উচিত। তাঁর মন্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়।
এরপরই শুক্রবার বিধাননগর দক্ষিণ থানায় তৃণমূলের ১০ জন বিধায়ক যৌথভাবে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁদের দাবি ছিল, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলির লেনদেন বন্ধ করে তদন্ত শুরু করা হোক।
অভিযোগ জমা পড়ার পর তদন্তকারী সংস্থা সক্রিয় হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে তিনটি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে দেওয়া হয়। এই পদক্ষেপের বৈধতা নিয়েই এবার আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে ‘কালীঘাট তৃণমূল’।
অন্যদিকে, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ার ঘটনায় দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধও আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সূত্রের খবর, অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার দাবিকে কেন্দ্র করে অরূপ বিশ্বাসকে শোকজ নোটিস পাঠিয়েছে তৃণমূল নেতৃত্ব।
জবাবে অরূপ বিশ্বাসও দলের আর্থিক লেনদেন নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, দলের বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং বেশ কিছু আগাম সই করা চেক কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, দলের তহবিলের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একাধিক অসঙ্গতি থাকতে পারে, যা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে বিষয়টি শুধুমাত্র ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বরং তা ক্রমশ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সংঘাতের বৃহত্তর রূপ নিচ্ছে বলে মনে করছে পর্যবেক্ষক মহল।
এখন নজর কলকাতা হাই কোর্টের দিকে। আদালত এই ফ্রিজের নির্দেশের আইনি ভিত্তি, তদন্তের প্রয়োজনীয়তা এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির বক্তব্য শুনে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার উপরই অনেকটাই নির্ভর করছে তৃণমূলের পরবর্তী রাজনৈতিক সমীকরণ।
একদিকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে যাওয়ার প্রশ্ন, অন্যদিকে দলের অন্দরে আর্থিক লেনদেন নিয়ে প্রকাশ্য মতবিরোধ— এই দুইয়ের জেরে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নতুন মোড় নিতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।



