২১ জুলাই শহিদ দিবসকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে এবার এক নতুন জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে পরিচিত এই দিনটিকে ঘিরে এবার দলের মধ্যেই দুই ভিন্ন অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে কালীঘাট ঘনিষ্ঠ নেতৃত্ব, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়পন্থী গোষ্ঠী—উভয় পক্ষই পৃথকভাবে কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা রাজনৈতিক মহলে অভূতপূর্ব বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সূত্রের খবর, শনিবার কলকাতা পুলিশ কমিশনারের কাছে পৃথক দুটি চিঠি জমা পড়েছে। একটি চিঠি এসেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ শিবিরের পক্ষ থেকে, যেখানে ধর্মতলায় ঐতিহ্যবাহী ২১ জুলাই সমাবেশ আয়োজনের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, একই দিনে তপসিয়ার একটি বেসরকারি হোটেলে বৈঠকের পর ঋতব্রতপন্থী গোষ্ঠীও একই ধরনের কর্মসূচির অনুমতি চেয়ে আবেদন জানিয়েছে। ফলে একই দিনে একই শহরে একই রাজনৈতিক পরিচয়ের দুই ভিন্ন শিবিরের কর্মসূচি ঘিরে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘটনা তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ সংগঠনগত বিভাজনের এক স্পষ্ট প্রকাশ। একসময় যেটি দলের ঐক্য ও শক্তির প্রতীক ছিল, সেই ২১ জুলাই আজ বিভাজনের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই প্রদেশ কংগ্রেসও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা শহিদ মিনারে পৃথকভাবে ২১ জুলাই স্মরণ কর্মসূচি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কংগ্রেস নেতৃত্বের দাবি, ১৯৯৩ সালের মহাকরণ অভিযানে নিহত ১৩ যুব কংগ্রেস কর্মীর স্মৃতিতে এই দিনটি পালন করা তাদের ঐতিহাসিক অধিকার এবং রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা।
এই পরিস্থিতিতে কলকাতা পুলিশের সামনে তৈরি হয়েছে একাধিক কর্মসূচির অনুমতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বড় চ্যালেঞ্জ। একই দিনে শহরের গুরুত্বপূর্ণ অংশে তিনটি পৃথক রাজনৈতিক কর্মসূচি হলে যান চলাচল, জনসমাগম এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রের আশঙ্কা।
ঋতব্রতপন্থী শিবিরের এক মুখপাত্রের বক্তব্য, তাদের উদ্দেশ্য শহিদ পরিবারের প্রকৃত মর্যাদা ফিরিয়ে আনা এবং কর্মসূচিকে আরও ‘আসল রূপ’ দেওয়া। তাঁদের দাবি, এতদিন শহিদ দিবসের মঞ্চে জনসমাগম ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপস্থিতি প্রাধান্য পেয়েছে, যেখানে শহিদ পরিবারের গুরুত্ব অনেক সময় আড়ালে থেকে গেছে। তাই এবার তারা সেই পরিবারগুলিকে সামনে রেখে আলাদা কর্মসূচির পরিকল্পনা করছে।
অন্যদিকে কালীঘাট শিবিরের তরফে এখনও পর্যন্ত প্রকাশ্যে কঠোর প্রতিক্রিয়া না এলেও অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যাচ্ছে, ধর্মতলার ঐতিহ্যবাহী সমাবেশ কোনওভাবেই পরিবর্তন করা হবে না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, সীমিত সংখ্যক লোক নিয়েও এই কর্মসূচি পালন করা হবে।
এই দ্বন্দ্বের মাঝে রাজনৈতিক কটাক্ষও শুরু হয়েছে। ঋতব্রত শিবিরের এক মুখপাত্র দাবি করেছেন, যাঁরা বিধানসভায় শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে পারেননি, তাঁদের কর্মসূচির গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে। একইসঙ্গে তাঁদের দাবি, এবার শহিদ দিবস হবে শহিদ পরিবারের প্রকৃত সম্মান প্রদর্শনের মঞ্চ।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এই পরিস্থিতি শুধু সংগঠনগত দ্বন্দ্ব নয়, বরং তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দিতে পারে। একই দিনে একই কর্মসূচি নিয়ে আলাদা আলাদা চিঠি জমা পড়া প্রশাসনিকভাবেও একটি বিরল পরিস্থিতি।
প্রশাসনের তরফে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। তবে অনুমান করা হচ্ছে, কলকাতা পুলিশ নিরাপত্তা ও যান চলাচলের বিষয়টি মাথায় রেখে শর্তসাপেক্ষ অনুমতি বা বিকল্প ব্যবস্থার পথে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে ২১ জুলাই এবার শুধুই স্মরণ নয়, বরং রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শন ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠতে চলেছে—এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক মহল।



