ব্রিকস থেকেই সংস্কারের বার্তা মোদির
ব্রিকস সম্মেলনের মঞ্চে বিশ্বের বর্তমান ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে সরব হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন।
মোদির যুক্তি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গিয়েছে। অথচ সেই পরিবর্তনের যথেষ্ট প্রতিফলন এখনও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলিতে দেখা যায় না।
এই কারণেই রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা জোর দিয়ে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্য ছিল, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে এমন জায়গায় পৌঁছতে হবে যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বার্থ এবং মতামতের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব থাকে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলির ভূমিকা আরও বাড়ানোর প্রশ্নটিই মোদির বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে।
মোদির বক্তব্যের পর রাষ্ট্রসংঘের মুখপাত্রের মন্তব্য
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টেফান ডুজারিচের মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তিনি জানিয়েছেন, মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছেন। তাঁর মতে, বর্তমান আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদকে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে হবে।
ডুজারিচের বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—আজকের পৃথিবীর বাস্তবতা যেন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির কাঠামোয় প্রতিফলিত হয়। শুধু নিরাপত্তা পরিষদ নয়, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য বহুপাক্ষিক সংস্থার ক্ষেত্রেও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থাৎ ১৯৪৫ সালে যে আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালের বিশ্বে সেটিকে অপরিবর্তিত রাখা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।
এখন নিরাপত্তা পরিষদে কারা স্থায়ী সদস্য?
বর্তমানে রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পাঁচটি দেশ—চিন, ফ্রান্স, রাশিয়া, আমেরিকা এবং ব্রিটেন।
এই পাঁচ দেশের হাতেই রয়েছে ভেটো ক্ষমতা। অর্থাৎ গুরুত্বপূর্ণ কোনও প্রস্তাবের ক্ষেত্রে এই দেশগুলির একটির বিরোধিতাও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আটকে দিতে পারে।
অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিষদের আরও দশটি অস্থায়ী সদস্য থাকে, যাদের নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য নির্বাচিত করা হয়। কিন্তু তাঁদের হাতে স্থায়ী সদস্যদের মতো ভেটো ক্ষমতা থাকে না।
এই ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন উঠছে। কারণ, বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যা, অর্থনীতি, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের তুলনায় অনেকটাই বদলে গিয়েছে।
ভারতের দাবি কতটা জোরালো?
রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী সদস্যপদের দাবি বহু বছর ধরেই করে আসছে ভারত। নয়াদিল্লির যুক্তি, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত।
ভারত আরও মনে করে, উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থ এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন।
এই অবস্থান থেকেই নিরাপত্তা পরিষদের সম্প্রসারণের পক্ষে বারবার সওয়াল করেছে নয়াদিল্লি।
মোদির সাম্প্রতিক বক্তব্যেও সেই বৃহত্তর সংস্কারের দাবিই উঠে এসেছে। ফলে রাষ্ট্রসংঘের পক্ষ থেকে একই ধরনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলায় ভারতের দাবিকে ঘিরে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
চিনকে পাশে নিয়েই ভারতের দাবি
এই ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দিকও রয়েছে। ব্রিকস মঞ্চে মোদি যখন নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের কথা বলছেন, তখন তাঁর পাশে উপস্থিত ছিলেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের প্রশ্নে চিনের অবস্থান অতীতে সবসময় নয়াদিল্লির প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। ফলে শি-র উপস্থিতিতে মোদির এই বক্তব্য আলাদা তাৎপর্য বহন করছে।
তবে ব্রিকস মঞ্চে চিনের প্রেসিডেন্টের উপস্থিতি মানেই বেজিং ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের প্রস্তাব সমর্থন করেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না।
ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলির একটি হল নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের পক্ষে প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক ঐকমত্য তৈরি করা।
স্থায়ী সদস্য হলে কী বদলাবে?
ভারত যদি ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নয়াদিল্লির প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হবে ভেটো ক্ষমতা পাওয়া। বর্তমানে স্থায়ী পাঁচ সদস্যের হাতে যে বিশেষ ক্ষমতা রয়েছে, সম্প্রসারিত পরিষদে ভারত স্থায়ী সদস্য হলে সেই ক্ষমতার অংশীদার হতে পারে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, শান্তিরক্ষা এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ে ভারতের অবস্থান তখন আরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারবে।
তবে স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়া মানেই যে ভারত অন্য কোনও দেশের উপর ‘ছড়ি ঘোরাতে’ পারবে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। ভেটো ক্ষমতা মূলত রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব আটকে দেওয়ার একটি বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতা। এটি কোনও দেশের উপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা নয়।
রাষ্ট্রসংঘের বক্তব্য কি ভারতের সদস্যপদ নিশ্চিত করছে?
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি রয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন ঠিকই, কিন্তু নির্দিষ্টভাবে ভারতকে স্থায়ী সদস্য করার ঘোষণা দেননি।
ফলে এই বক্তব্যকে ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ নিশ্চিত হওয়ার বার্তা হিসেবে দেখা যাবে না।
নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো বদলাতে হলে রাষ্ট্রসংঘের সদস্য দেশগুলির মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। সংস্কারের ধরন, নতুন সদস্যের সংখ্যা, ভেটো ক্ষমতার কাঠামো—প্রতিটি বিষয় নিয়েই মতপার্থক্য রয়েছে।
ভারত ছাড়াও আরও কয়েকটি দেশ নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী প্রতিনিধিত্বের দাবি জানিয়ে আসছে। ফলে শুধু রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব সংস্কারের পক্ষে মত দিলেই বিষয়টি চূড়ান্ত হয়ে যাচ্ছে না।
‘গ্লোবাল সাউথ’-এর প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন
নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারের বিতর্কে ‘গ্লোবাল সাউথ’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এশিয়া, আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকার বহু দেশ মনে করে, বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিতে তাদের প্রতিনিধিত্ব তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বের তুলনায় কম।
বিশ্ব অর্থনীতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলির ভূমিকা বেড়েছে। বহু নতুন আঞ্চলিক শক্তির উত্থান ঘটেছে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের কাঠামোয় সেই পরিবর্তন প্রতিফলিত হয়নি।
ভারত এই বৃহত্তর দাবির অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে উঠেছে। তাই নয়াদিল্লির বক্তব্য শুধু নিজেদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবি নয়, বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও প্রতিনিধিত্বমূলক করার প্রয়োজনীয়তার সঙ্গেও যুক্ত।
ভারতের সামনে এখনও বড় বাধা
রাষ্ট্রসংঘের সংস্কারের পক্ষে সমর্থন বাড়লেও ভারতের স্থায়ী সদস্যপদের পথে একাধিক রাজনৈতিক বাধা রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য নতুন কোনও দেশকে কীভাবে গ্রহণ করবে এবং ভেটো ব্যবস্থার সম্প্রসারণে তাদের অবস্থান কী হবে।
বিশেষ করে চিনের অবস্থান ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেজিংয়ের সঙ্গে সীমান্ত এবং কৌশলগত বিষয়ে ভারতের একাধিক মতপার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নিয়ে অন্যান্য দাবিদার দেশগুলির মধ্যেও সমন্বয় প্রয়োজন। আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব, জাপান, ব্রাজিল, জার্মানি-সহ বিভিন্ন দেশের দাবিও এই বৃহত্তর আলোচনার অংশ।
কূটনীতির জন্য নতুন সুযোগ
তবু রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিবের দপ্তর থেকে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা প্রকাশ্যে আসা ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরে যে যুক্তি তুলে আসছে—বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আজকের বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া প্রয়োজন—রাষ্ট্রসংঘের বক্তব্যে সেই যুক্তির সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে।
এর ফলে ভবিষ্যতে ভারত তার স্থায়ী সদস্যপদের দাবিকে আরও জোরালো করার সুযোগ পেতে পারে।
বিশেষ করে ব্রিকস এবং ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর মঞ্চকে ব্যবহার করে ভারত যদি বৃহত্তর দেশগুলির সমর্থন সংগঠিত করতে পারে, তাহলে সংস্কারের প্রশ্নে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারের দাবিতে মোদির বক্তব্যের পর রাষ্ট্রসংঘের পক্ষ থেকে যে বার্তা এসেছে, তা নিঃসন্দেহে ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে ইতিবাচক। কিন্তু এটিকে এখনই ভারতের স্থায়ী সদস্যপদ নিশ্চিত হওয়ার ঘটনা বলা যাবে না। বরং আন্তর্জাতিক মহলে ১৯৪৫ সালের কাঠামো বদলে ২০২৬ সালের বাস্তবতা প্রতিফলিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা জোরদার হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। সেই আলোচনায় ভারত কতটা সমর্থন আদায় করতে পারে, এবং চিন-সহ বর্তমান স্থায়ী সদস্যরা শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেয়, তার উপরই নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিষদে নয়াদিল্লির ভবিষ্যৎ।



