রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের কয়েকজন সাংসদের স্বাক্ষর সংবলিত নথি ঘিরে। সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসা কয়েকটি পাতায় মোট ১৯ জন সাংসদের স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সেই নথিকে কেন্দ্র করেই প্রশ্ন উঠেছে, লোকসভায় কি তৃণমূলের একটি অংশ আলাদা সংসদীয় পরিচয় দাবি করতে চলেছে?
সূত্রের দাবি, এই সাংসদেরা নাকি লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার কাছে একটি আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন। সেই চিঠিতে তাঁরা পৃথক সংসদীয় ব্লক হিসেবে স্বীকৃতি চেয়েছেন বলেই খবর। যদিও সংশ্লিষ্ট চিঠির পূর্ণাঙ্গ কপি এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। যে কাগজগুলি সামনে এসেছে, সেগুলি আদৌ ওই আবেদনপত্রের অংশ কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ফলে গোটা বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে।
প্রকাশিত নথিতে প্রথমেই দেখা গিয়েছে বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের স্বাক্ষর। তাঁর নামের পাশে ‘চিফ হুইপ’ উল্লেখ করা রয়েছে। এরপর রয়েছে বীরভূমের সাংসদ শতাব্দী রায়ের নাম, যাঁর পাশে ‘ডেপুটি লিডার’ লেখা হয়েছে। এই দুটি পদবিই রাজনৈতিক মহলের নজর কেড়েছে, কারণ পৃথক ব্লক গঠনের ক্ষেত্রে নেতৃত্বের কাঠামো আগে থেকেই নির্ধারণ করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
স্বাক্ষরকারীদের তালিকায় আরও রয়েছেন মথুরাপুরের সাংসদ বাপি হালদার, বর্ধমান পূর্বের সাংসদ শর্মিলা সরকার, হাওড়ার প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়, কোচবিহারের জগদীশ বর্মা বসুনিয়া, বোলপুরের অসিত মাল এবং বাঁকুড়ার অরূপ চক্রবর্তী। তালিকার পরবর্তী অংশে ঝাড়গ্রামের সাংসদ কালীপদ সরেনের নামও দেখা গিয়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে কয়েকজন পরিচিত মুখকে ঘিরে। প্রকাশিত নথিতে ঘাটালের সাংসদ তথা অভিনেতা দেবের স্বাক্ষর রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। একইভাবে মেদিনীপুরের সাংসদ জুন মালিয়া এবং ব্যারাকপুরের সাংসদ পার্থ ভৌমিকের নামও সামনে এসেছে। ফলে রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে ঘিরে আগ্রহ আরও বেড়েছে।
নথিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। ক্রমিক নম্বর অনুযায়ী তালিকা এগোলেও ১৩ নম্বর স্থানে কোনও নাম দেখা যায়নি। এরপর জঙ্গিপুরের সাংসদ খলিলুর রহমান, মুর্শিদাবাদের আবু তাহের খান, বহরমপুরের ইউসুফ পাঠান, আরামবাগের মিতালি বাগ এবং কলকাতা দক্ষিণের মালা রায়ের নাম রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়াও পৃথক দু’টি স্থানে হুগলির সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং যাদবপুরের সাংসদ সায়নী ঘোষের স্বাক্ষর দেখা গিয়েছে। বিদ্রোহী শিবিরের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বক্তব্য, এই দুই সাংসদ নাকি পরে ওই নথিতে সই করেছিলেন। যদিও এই দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি সত্যিই এত সংখ্যক সাংসদ পৃথক ব্লকের পক্ষে অবস্থান নিয়ে থাকেন, তবে তা লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক অবস্থানের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও সাংসদ প্রকাশ্যে এই বিষয়ে মুখ খোলেননি। ফলে অনুমান এবং রাজনৈতিক জল্পনার উপরই পুরো আলোচনা দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি সামনে এসেছে বিদ্রোহী শিবিরের সূত্র মারফত। তাঁদের বক্তব্য, প্রস্তাবিত নতুন ব্লকের নেতৃত্বে কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সেই কারণেই নথিতে তাঁর নাম প্রথমে এবং চিফ হুইপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
তবে এই গোটা ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল, স্পিকারের দপ্তরে আদৌ এমন কোনও আবেদন পৌঁছেছে কি না। এখনও পর্যন্ত লোকসভার সচিবালয় বা স্পিকারের অফিস থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়নি। ফলে আবেদন জমা পড়েছে কি না, পড়লেও কখন জমা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই নথি সামনে আসার সময়টাও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে তৃণমূলের অন্দরে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য ও সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস নিয়ে একাধিক আলোচনা হয়েছে। সেই আবহে একসঙ্গে ১৯ জন সাংসদের নাম সামনে আসা স্বাভাবিকভাবেই কৌতূহল বাড়িয়েছে।
এদিকে বিদ্রোহী শিবিরের ঘনিষ্ঠ সূত্র আরও দাবি করেছে, তাঁরা বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকারকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও এই দাবিরও কোনও সরকারি নথি বা প্রকাশ্য ঘোষণা এখনও সামনে আসেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জটিল হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও এখনও পর্যন্ত এই স্বাক্ষর-সংক্রান্ত নথি নিয়ে কোনও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে রাজনৈতিক মহল এখন অপেক্ষা করছে, প্রকাশ্যে আসা নথি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সাংসদরা কী অবস্থান নেন এবং লোকসভার স্পিকারের দপ্তর থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা আসে কি না।
সব মিলিয়ে, ১৯ সাংসদের স্বাক্ষর ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক আপাতত দিল্লি ও কলকাতার রাজনৈতিক করিডরে আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। নথিগুলির সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির প্রতিক্রিয়ার উপরই নির্ভর করবে এই জল্পনার ভবিষ্যৎ গতি।



